রহস্যময়ী শূন্যের সাতকাহন

কিন্তু ভারতীয় পণ্ডিতরা নয় অঙ্কের পর দশ অঙ্কের নাম দেন শূন্য বিন্দু এবং তত্পর সংক্ষেপে কেবল শূন্যের নামে বৃত্ত বা সার্কেল বহাল তবিয়তে স্থান করে নেয়। তবে কেউ কেউ ধারণা করেন যে, আনুমানিক ১৩০ খৃষ্টপূর্বে শূন্যের প্রতীক হিসেবে প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদ টলেমি তাঁর আল মাজেস্ত নামক গ্রন্থে “০” ব্যবহার করেছেন। এদিকে শূন্য (০) এর ইংরেজী হলো- Zero, যা এসেছে আরবি আজ-জিফর (As-sifar) শব্দ থেকে। আর এ বিশ্বের বেশীর ভাগ মানুষ শূন্যের প্রতীক “০” ব্যবহার করলেও আরবি সংখ্যা লিপিতে এখনও শূন্যের স্থলে বিন্দু (.) ব্যবহার করা হয়। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, শূন্যের ব্যাপারে আরবের শ্রেষ্ঠ গণিতবিদ আল খারিজিমি এবং তত্পর বার শতকে ইবনে এজরার অভিমত প্রণিধানযোগ্য। শূন্যকে নিয়ে তাঁদের লিখিত গবেষণা প্রসূত অভিসন্ধর্ভ ইউরোপের স্কলাদের নজরে আসে। আর সেই কালে যুগান্তকারী ইটালীয় মহিলা গণিতবিদ ফিবোনাকি (Fibonacci) এ বিষয়ে বই লিখেন, যা সে সময়ে আলোড়নের ঢেউ তুলে। যাহোক, শূন্যের ক্ষেত্রে ভারত ও আরব উভয়েরই মহতী কার্যক্রম অনস্বীকার্য এবং প্রশংসা পাওয়ার দাবী রাখে। আর তাঁদের জ্ঞানগর্ভ ধারণা পরবর্তীকালে পরিপূর্ণ ফসল হিসেবে ধরা দেয় গ্যালিলিও, লেবনিজ, দেকার্তে এবং নিউটনের চিন্তার জগতে। এদিকে বর্তমানে শূন্য দু’ভাবে ব্যবহূত হয়ে থাকে যেমন- ক) শূন্য স্থান নির্দেশক এবং খ) সংখ্যা নির্দেশক হিসেবে।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, শূন্য অথবা এর প্রতীকী বৃত্ত বা সার্কেলের ব্যাপারে কারো একক কৃতিত্ব নেই। এটি এই বিশ্বের বিগত বিভিন্ন সভ্যতার একটি বস্তুনিষ্ঠ ফসল। এটাকে ঘিরে সবাই কম-বেশী চিন্তা ভাবনা করেছেন। সেহেতু প্রতীক হিসেবে গোল হওয়ার ব্যাপারে যে অনুমিত বিষয়াদি বিবেচনায় আনা হয়েছে, তা তুলে ধরা হলো। যেমন- ক) এই মহাবিশ্বে পরামাণু থেকে আরম্ভ করে বড় বড় গ্রহ-নক্ষত্র পর্যন্ত গোল হিসেবে বিরাজমান; খ) কোন কিছুর সম্পূর্ণতা আনয়নে ৩৬০০ ডিগ্রির কভার করতে হয়, যা গোল হিসেবে বিদ্যমান; গ) পদার্থবিদ্যার আওতায় সাধারণত কোন কিছু দূরে নিক্ষেপ করলে শেষ পর্যন্ত তা ঘুরে ঘুরে নিচে পরে থাকে; ঘ) বিদ্যুতের ব্যাপারে সার্কিট পূরণ না হলে কার্যকরী হয় না; ঙ) পবিত্র কাবা শরীফ একবার তাওয়াফ করতে গোলাকারের আওতায় একটি বৃত্ত রচনা করতে হয়; চ) বর্তমান সভ্যতার আদি ভিত্তি চাকা সেটা গোলাকার; ছ) অনেকে মনীষীদের ধারণা এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির আগে শূন্য ছিল এবং ধ্বংসের পরেও শূন্য হয়ে যাবে, আর এ পর্যায়ে আসতে ৩৬০০ অবশ্যই হতে হবে; জ) সনাতন ধর্মের সুদর্শন চক্র (গোলাকার); ঝ) জীব সৃষ্টির অন্যতম ভিত্তি হলো ডিম্বাণু, যা প্রায় ক্ষেত্রে গোলাকার হিসেবে পরিলক্ষিত হয়ে থাকে; ঞ) সৌর মণ্ডলে সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহগুলোর বৃত্তাকারে প্রদক্ষিণ;

ট) এ পৃথিবীর অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমাংশ প্রসূত ৩৬০০ এর আওতায় সময় ও দূরত্বের ক্ষেত্রে ১ ডিগ্রি সমান যথাক্রমে ৪ মিনিট ও ৬৯ মাইল; ঠ) সময়ের ব্যাপারে ঘড়ির ঘন্টা, মিনিট ও সেকেণ্ডের কাঁটা বৃত্তাকারে ঘুরে সময় নির্দেশ করে থাকে; ড) মানুষসহ সমগ্র জীবজগত যার সাহায্যে দেখে থাকে, তাহলো “চোখের মণি” যা সাধারণত গোলাকার থাকে ।

পরিশেষে এই নিবন্ধে উল্লিখিত বিষয়াদির আলোকে শূন্য বা গোলাকার হওয়ার পেছনে উপর্যুক্ত বস্তুনিষ্ঠ ধারণা রহস্যময়ী হলেও এর সুদূরপ্রসারী সূক্ষ্মতার আড়ালে বাস্তবতা আছে। আর এটাই চিন্তা করে হয়তো কম্পিউটারের অর্ধেক ভাষা হিসেবে এই শূন্য সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে অনেক বিজ্ঞানী এই মর্মে বলে থাকেন যে শূন্যের আদলে ধীর গতিতে কোন বস্তু চলতে থাকলে অনেক সময় বিভ্রান্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। তাই তাঁরা শূন্যবিহীন সংখ্যার কথা ভাবছেন। অনেকে আবার শূন্যবিহীন রোমান ও গ্রীক সংখ্যার কথাও তুলছেন। এর মধ্যে একজন প্রখ্যাত গণিতবিদ শূন্যের পরিবর্তে অন্য কিছু ভাবছেন। সেহেতু এই ডিজিট কি এই ভাবেই থাকবে, না কি অন্য কিছু হবে তা কেবল ভবিষ্যতই বলবে!