রাজধানীর নয়াপল্টনে সংঘর্ষের মামলায় বিএনপি নির্বাহী কমিটির সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরীসহ সাতজনের পাঁচদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল শুক্রবার বিকালে ঢাকা মহানগর হাকিম সত্যব্রত শিকদার শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
অপর ছয়জন হলেন- ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক আরিফা সুলতানা রুমা, রাজধানীর খিলক্ষেত থানা বিএনপির সভাপতি ইউসুফ মৃধা, কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার যুবদল নেতা আবুল হাশিম সবুজ, বরগুনার তালতলী উপজেলার বিএনপি নেতা আমির হোসেন এবং কর্মী মো. মহসিন ও মামুনুর রশিদ খোকন। এ নিয়ে পল্টন থানায় দায়ের করা তিন মামলায় পুলিশ ৭২ জনকে গ্রেফতার করেছে। এদের মধ্যে বৃহস্পতিবার রিমান্ড পাওয়া ৩৮ জন ও গতকাল রিমান্ড পাওয়া সাতজনসহ মোট ৪৫ জনকে গোয়েন্দা দপ্তরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হয়েছে।
গত বুধবারের সংঘর্ষের ঘটনায় গণমাধ্যমে আসা ছবিতে নিপুণকে লাঠি হাতে মিছিলে দেখা যায়। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় নাইটিঙ্গেল মোড় থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। অপরদিকে একই সময় বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক, সংগীতশিল্পী বেবী নাজনীনকে আটক করা হলেও পরে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। আর আরিফা সুলতানা রুমাকে গ্রেফতার করা হয় হাইকোর্ট এলাকা থেকে। তবে অপর পাঁচজনকে কোন এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে পুলিশ তা নিশ্চিত করেনি।
এদিকে পুলিশের কাউন্টার টেররিজমের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেছেন, পল্টনের নাশকতার ঘটনায় ভিডিও ফুটেজ দেখে সুনির্দিষ্টভাবে অপরাধীদের শনাক্ত করা হচ্ছে। এ ঘটনায় নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করা হবে না। নির্বাচনের সময় ফৌজদারি অপরাধ না করলে এবং নির্বাচনী আচরণবিধি না ভাঙলে কাউকে গ্রেফতার করা হবে না।
সংসদ নির্বাচনে অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা নির্বাচন কমিশনের অধীনে কাজ করছি। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে এবং নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন আইনি পদক্ষেপ অব্যাহত রয়েছে। কথা দিচ্ছি, শুধু ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হলেই আমরা আইন প্রয়োগে বাধ্য হবো।
রিমান্ডের ৪৫ জন গোয়েন্দা দপ্তরে : মামলার তদন্ত সম্পর্কে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার ( পূর্ব) খোন্দকার নুরন্নবী বলেন, পল্টন থানায় দায়ের করা তিন মামলায় ৭২ জন গ্রেফতার হয়েছে। বৃস্পতিবার রাতে গ্রেফতার করা হয় নিপুণ চৌধুরীসহ সাতজন। ওই দিন রিমান্ড মঞ্জুর হওয়া ৩৮ ও শুক্রবার রিমান্ড পাওয়া সাতজনকে (মোট ৪৫) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গোয়েন্দা দপ্তরে আনা হয়েছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, অগ্নিসংযোগকারী ও হেলমেটধারীদের গতকাল পর্যন্ত (পল্টন থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শাহজালাল খন্দকারসহ) গ্রেফতার করা যায়নি। রিমান্ডে থাকা আসামিরা হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো তথ্য দিয়েছে কীনা— এমন প্রশ্নের জবাবে খোন্দকার নুরন্নবী বলেন, বিস্তারিতভাবে জিজ্ঞাসাবাদে প্রকৃত তথ্য পাওয়া যাবে।
সাতজনের রিমান্ড মঞ্জুর : গতকাল দুপুরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক কামরুল ইসলাম নিপুণ রায় চৌধুরীসহ সাতজনের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে হাজির করেন। শুনানি শেষে বিচারক পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর সালমা হাই টুনি বলেন, পল্টনে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনার পরিকল্পনাকারী কারা ছিল, তা জানতে আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি। অপরদিকে আসামি পক্ষের অ্যাডভোকেট নিপুণের বাবা আইনজীবী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, আমার মক্কেলরা কোনোভাবেই ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের সঙ্গে জড়িত নয়। সরকার নিজেরা এসব করে তাদের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে দিয়েছে। শুনানির সময় আসামি পক্ষের আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া ও নিপুণ রায়ের বাবা অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী ছাড়াও ৩০ জন আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন। নিপুণ রায় চৌধুরী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের পুত্রবধূ। শুনানির সময় আদালতে গয়েশ্বর রায়ও নিজেও উপস্থিত ছিলেন। গত ১৪ নভেম্বর পল্টন থানায় দায়ের তিন মামলার তদন্ত কাজ মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (পূর্ব বিভাগে) কাছে হস্তান্তর করা হয়।
উল্লেখ্য, গত বুধবার নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে সংঘর্ষে পুলিশের অন্তত ২৩ জন, বিএনপির অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মী আহত হন। ওই ঘটনায় তিন মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৪৮৮ জন। আসামির তালিকায় রয়েছেন— বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, দলটির যাত্রাবাড়ীর সভাপতি নবীউল্লাহ নবী, ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) আকতারুজ্জামান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কফিল উদ্দিন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশিদ হাবিব, মিডিয়া উইং সামসুদ্দিন দিদার, দফতর সম্পাদক বেলাল আহমেদ, নির্বাহী কমিটির সদস্য অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম, যুবদলের সভাপতি রফিকুল ইসলাম মজনু, ছাত্রদল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি জহির উদ্দিন তুহিন, কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক আরিফা সুলতানা রুমা প্রমুখ।