লকডাউন কার্যকরই বড় চ্যালেঞ্জ

ছোট দেশ। প্রচুর মানুষ। চাহিদা বেশি। প্রাপ্তি কম। নেই এর পাল্লা ভারী। ফলাফল হতাশা। এতসব চ্যালেঞ্জ নিয়ে ভালো থাকা! এ যেন কেবলই বেঁচে থাকা। সারা পৃথিবীর মতো আমাদের বাংলাদেশও আক্রান্ত করোনায়। বিপর্যস্ত দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা। দেশের মানুষ অনেকটাই নির্ভার হয়েই গিয়েছিল—হয়তো মুক্তি মিলেছে করোনা থেকে; কিন্তু এর মধ্যেই শুরু হয়েছে আবার করোনার ভয়াবহতা। যে লকডাউন শব্দটি মানুষের মুখ থেকে চলে যাচ্ছিল, সেটি আবার চলে এলো জটিল আকারে। এ পরিস্থিতিতে জীবনকে চালিয়ে নেওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি সংগ্রাম করতে হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষকে। যাদের দুবেলা খাবার জোগাড় করার জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শ্রম বিনিয়োগ করতে হয়। এ শ্রমের অর্থে চুলায় খাবারের হাঁড়ি বসে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গত বছর করোনা শুরুর সময় থেকে মানুষের যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল তার চেয়ে এ বছর আরো বেশি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে আপ্রাণ চেষ্টা চালানো হচ্ছে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। বিভিন্ন কারণে ইচ্ছে করলেই প্রয়োজন মতো লকডাউন দেওয়া সম্ভবপর হয় না সরকারের পক্ষে—এ কথা অনেকের পক্ষেই বোঝা কঠিন। সংক্রমণ থেকে মানুষের জীবন বাঁচানো যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য মানুষের আয়-রোজগারের পথ উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রেও রয়েছে সরকারের দায়বদ্ধতা। উচ্চ আয়ের মানুষ যেমন স্বাস্থ্যসম্মতভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে, ঠিক তেমনি নিম্ন আয়ের মানুষও সরকারের মুখের দিকে চেয়ে রয়েছে। ইতিমধ্যে সরকার ১৮ দফা নির্দেশনা ঘোষণা করেছে। এই ১৮ দফা নির্দেশনার কিছু অংশ মেনে চলছে জীবনসংগ্রাম। একদিকে পেটের চিন্তা অন্যদিকে বেঁচে থাকা। দুটোর মধ্যে সেতু তৈরি করতেই মূলত এ নির্দেশনা। যেসব নির্দেশা প্রদান করা হয়েছে সত্যিকার অর্থেই সব নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা গেলে অবশ্যই করোনা থেকে আমরা দূরে থাকতে পারব—এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তবে এতে মানুষের স্বাভাবিক কর্মজীবনে ব্যাঘাত ঘটবে—এটা অস্বীকার করা যায় না। বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষের চিন্তা অনেকটাই বেশি। কারণ স্বাভাবিক কাজকর্ম বন্ধ থাকলে তাদেরই বেশি ক্ষতি।

আরেকটি বিষয়ের দিকে নজর দিলে দেখা যায় যে, শহর এবং গ্রামের লকডাউনের চিত্র ভিন্ন। এ যেন ভিন্ন দেশ, ভিন্ন মানুষ, ভিন্ন দর্শন। গ্রামের ক্ষেত্রে যেন করোনার সংজ্ঞাই পালটে যায়। সচেতনতার বালাই নেই গ্রামীণ জীবনব্যবস্থায়। ইতিমধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলায় মাঠ প্রশাসন লকডাউন কার্যকর করার লক্ষ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে; কিন্তু এসব প্রস্তুতি দিয়েই কি জীবনযাত্রা লক করা সম্ভব? জীবন বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে ঘর থেকে বের হয়ে আসছে মানুষ। আবার অপ্রয়োজনেও মানুষ বাহিরমুখী। কর্মের দিকে ধাবিত হচ্ছে অর্থের সন্ধানে। সরকারের যেসব প্রস্তুতি মাঠ পর্যায়ে রয়েছে তাতো অনেকটাই আইন মানতে বাধ্য করার প্রস্তুতি। আমাদের দেশের মানুষ আইন ভাঙতেই পছন্দ করেন বেশি। এই অবস্থায় সরকারের মানুষকে ঘরে রাখার পলিসি কতটা কার্যকর করতে পারবে সেটা ভেবে দেখার বিষয়। যেদিন লকডাউন ঘোষণা করা হলো সেদিন থেকেই দল বেঁধে মানুষ শহর ছাড়তে শুরু করেছে। এসব বিধি কার্যকর করার জন্য মানুষকে কিছু দিন নিজ নিজ অবস্থানে রাখাই শ্রেয় ছিল; কিন্তু শহরব্যবস্থায় জীবনকে ধরে রাখতে হলে কর্মের বিকল্প নেই। গ্রামীণ জীবনব্যবস্থা থেকে শহরের জীবনব্যবস্থা অনেক ব্যয়বহুল এবং বেশি যান্ত্রিক। ইতিমধ্যে সারা দেশে লকডাউন-বিরোধী আন্দোলনও দানা বেঁধে উঠেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে হবে। গত বছরও করোনার কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তবে এবারের লকডাউন আর বিগত বছরের লকডাউনের মধ্যে সরকার অনেকটাই পার্থক্য রেখেছে—এটা সবাইকে অনুধাবন করতে হবে। এটাকে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর বিধিনিষেধ নামেও আখ্যায়িত করা হয়েছে।

অবশ্য বিষেজ্ঞরা বলছেন, এ লকডাউন করোনা প্রতিরোধে বাস্তবসম্মত কোনো ভূমিকা নয়। প্রশাসনের লোকজন জনগণকে সম্পৃক্ত করে মাঠ পর্যায়ে লকডাউন বাস্তবায়ন করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে করেও খুব একটা সুফল আসছে বলে মনে হয় না। সরকারের ১৮ দফা নির্দেশনায় যেসব বিধিমালা আরোপ করা হয়েছে এর মধ্যে অনেক ফাঁক রাখা হয়েছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। অনেক জায়গায় কঠোর বিধিনিষেধ দেখাতে প্রশাসনকে বেকায়দায় পড়তে হয়েছে বলে জানা যায়। অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হয়, সরকার এসব বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে অনেকটাই নমনীয়। মোটকথা, আমাদের সমাজব্যবস্থায় মানুষ এখনো বুঝে উঠতে পারে নাই করোনার ভয়াবহতা। করোনার করুণ অবস্থা মনের মধ্যে প্রবেশ না করলে আইন প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। করোনা নির্মূল না হওয়ার পরও বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা আয়োজনের ক্ষেত্রে সরকারের বিধিনিষেধ কঠোর ছিল না বলে অনেকেই মনে করেন। সব কিছু মিলিয়ে সরকারের বর্তমান লকডাউন-ব্যবস্থাপনার বাস্তবায়ন করা অনেকটাই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেই করোনার প্রকোপ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং প্রচুর জানমালের ক্ষতি হবে। যা দেশের জন্য অনেকটাই অশনি সংকেত।  উপরোক্ত পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণের জন্য সরকারের সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেমন জরুরি, তেমনি সরকারের বিভিন্ন নির্দেশনা আমাদের মেনে চলা আবশ্যক। কারণ সরকারের পক্ষে কোনো নীতিই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়, যদি জনগণ সহায়তা না করেন। মানুষকে মনে রাখতে হবে—এসব বিধিনিষেধ আমাদের জন্য এবং আমাদের বাঁচানোর জন্য। সরকারের নির্দেশনা মেনে করোনামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করতে হবে আমাদের।

n লেখক : কলেজ শিক্ষক