প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতাকে হুমকিতে ফেলছে খেলাপি ঋণ

বহুল আলোচিত ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি বলে মনে করছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউট (পিআরআই)। এর মধ্যে সরকারি ব্যাংকগুলোর চলমান নাজুক পরিস্থিতিকে ইঙ্গিত করে দুই একটি ব্যাংক বাদে বাকি সরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণদান কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে দেশের অর্থনীতির এই থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বনানীতে পিআরআই’র কার্যালয়ে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা উপস্থানকালে এ মন্তব্য উঠে আসে। ব্যাংকিং খাতের সমস্যা সমাধানে এ খাতের সংস্কারসহ অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য ৫টি ইস্যুকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য সরকারকে পরামর্শ দেওয়া হয়। পিআরআই’র চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তারের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। আলোচনায় অর্থনীতিবিদ, বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাসহ বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। এম এ মান্নান ব্যাংকিং খাত, বিদেশি বিনিয়োগসহ কিছু বিষয়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ার কথা (গ্যাপ) স্বীকার করেন।

প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ড. জায়েদী সাত্তার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার চিত্র তুলে ধরেন। বিশেষত সরকারি ব্যাংকে বড় বড় ঋণগ্রহীতা ও ঋণখেলাপির বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারি ব্যাংকের শীর্ষ ২০ ঋণগ্রহীতার কাছেই মোট ঋণের এক তৃতীয়াংশ। কিছু ব্যাংকের অনিশ্চিত হিসাব বিবরণী (ব্যালেন্স শিট), পরিচালনা পর্ষদে পরিবারতন্ত্র, দুর্বল তদারকি, খেলাপির কারণে বেশি হারে সঞ্চিতি রাখতে বাধ্য হওয়ায় তারল্য সংকটসহ বেশকিছু কারণে এ খাতের উপর আস্থা কমে যাচ্ছে।

খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান মনোযোগ কমানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সরকারি দুই একটি ব্যাংক বাদে বাকি সরকারি ব্যাংকগুলোকে ঋণ প্রদানের পরিবর্তে আমানত সংগ্রহ করার বাধ্যবাধকতায় আনতে হবে। এছাড়া কর কাঠামোর সংস্কার, রপ্তানি বাণিজ্যের নীতিমালা পুনর্গঠন করা, শিক্ষা বিশেষত দক্ষতা উন্নয়নের মনোযোগ দেওয়া এবং নগর উন্নয়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নকে আগামী দিনগুলোতে সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সন্তোষ প্রকাশ করা হলেও বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগে গতি না আসা, কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় না হওয়া, বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধিতে গতি না আসা, সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হওয়া, কর্মসংস্থানের গতি কমে যাওয়া এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়াকে অর্থনীতির জন্য আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ঘাটতির ইস্যুটি উল্লেখ করে ভবিষ্যতে অনেক ব্যাংক টিকতে পারবে কিনা সে প্রশ্ন তোলেন। কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর জন্য অনেকেই বলেন। কিন্তু খেলাপি ঋণ নিয়ে বলেন না। ব্যাংক ঋণের ৭৫ হাজার কোটি টাকা আছে মামলায়। প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বিচার প্রক্রিয়াকে দ্রুত করা যাতে এসব অর্থ সহজে উদ্ধার করা যায়। এছাড়া আইনি কাঠামোর সংস্কারেরও তাগিদ দেন তিনি।

দেশের অর্থপাচার ইস্যুটিও আলোচনায় আসে। সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামান অর্থপাচার ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। ঢাকা চেম্বারের (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি ও নিউ এইজ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফিস ইব্রাহীম ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে দ্রুত স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠনের দাবি জানান। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত অবকাঠামোর উন্নয়নে জাতীয় অবকাঠামো উন্নয়ন তদারক কর্তৃপক্ষ (এনআইডিএমএ বা নিডমা) গঠনের প্রস্তাব দেন।

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান গত কয়েক বছরের অর্থনৈতিক অগ্রগতির বিষয়টি উল্লেখ করে আগামীতে আরো ভালো করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, দেশ কয়েক বছর আগের চাইতে এখন অনেক স্থিতিশীল। নির্বাচনের চাইতে উন্নয়নের বিষয়েই মানুষের মনোযোগ। উন্নয়নের কারণে মানুষ আমাদের ভোট দিয়েছে।