পেঁয়াজ আর বেশি করে কাঁচা মরিচের ঝাল দিয়ে পাবদা মাছের স্বাদ জীবনে ভোলার নয়। রীতিমতো জিভে জল এসে যায়। অথচ এই মাছটিই কিনা মাত্র কয়েক বছর আগে বিলুপ্তপ্রায় মাছের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছিল। শুধু এই মাছটির কথাই-বা বলছি কেন? ভোজনরসিকদের কাছে গুলশা, টেংরা, শিং, মেনি, গুতুম, গুজি আইড়, চিতল, ফলি, মহাশোলের গুরুত্বই-বা কম কিসে। মিঠা পানির বিলুপ্তপ্রায় এসব মাছে এখন বাজার ভরা। শুধু তাই নয়, দামও নাগালের ভেতরে।
আর যে মাছটি এখন আমজনতার মাছ হয়ে উঠেছে, সেই ইলিশের কথাই বা বাদ যাবে কেন? নতুন নতুন অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রতি বছরই বাড়ছে ইলিশের উত্পাদন। আর যে প্রতিষ্ঠানটি এসবের পেছনে গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছে সেটি হলো মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)। বিলুপ্ত প্রজাতির মাছ ফিরিয়ে আনতে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটির গবেষকরা। বর্তমানে মাছ উত্পাদনে বাংলাদেশের স্বয়ংসম্পূর্ণতার পেছনে প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে উল্লেখযোগ্য অবদান। গত ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে মাছ উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০ লাখ ৫০ হাজার টন। উত্পাদন হয়েছে ৪১ লাখ ৩৪ হাজার টন। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮৪ হাজার টন বেশি।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উত্পাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৩য় এবং বদ্ধ জলাশয়ে চাষকৃত মাছ উত্পাদনে ৫ম।
লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা
দেশের মত্স্যসম্পদ উন্নয়নে গবেষণা পরিচালনার জন্য বিএফআরআই একমাত্র জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান। চাহিদার নিরিখে গবেষণা পরিচালনা করে লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করাই প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য। ১৯৮৪ সালে মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের যাত্রা শুরু হয়। সেসময় দেশে মাছের উত্পাদন ছিল মাত্র ৮ লাখ টন। যা গত অর্থ বছরে এসে দাঁড়িয়েছে ৪১.৩৪ লক্ষ টনে। মাছের উত্পাদন বৃদ্ধিতে প্রতিষ্ঠানটি থেকে ইতোমধ্যে মত্স্য চাষ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ক ৬০টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এসব প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণের ফলে দেশে মাছের উত্পাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আর এর স্বীকৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি স্বর্ণপদকসহ দেশে-বিদেশে বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইনস্টিটিউটের ৫টি কেন্দ্র ও ৫টি উপকেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্র ও উপকেন্দ্রের মাধমে ইনস্টিটিউট গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
বিলুপ্ত মাছ ফিরিয়ে আনতে
কাজ করে বিএফআরআই
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) এর তথ্যমতে, দেশের মিঠা পানির ২৬০ প্রজাতির মাছের মধ্যে বর্তমানে ৬৪ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তপ্রায়। তবে গত এক দশকে মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট বিলুপ্তপ্রায় ১৮টি মাছের প্রজনন এবং চাষাবাদ কৌশল উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে। এই মাছগুলোর মধ্যে রয়েছে পাবদা, কালিবাউশ, গুলশা, টেংরা, শিং, মাগুর, কই, মেনি, গুতুম, গুজি আইড়, চিতল, ফলি, খলিসা, মহাশোল ইত্যাদি। এ প্রসঙ্গে মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, এসব মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উত্পাদনে সফলতার ফলে বিলুপ্তপ্রায় এ মাছগুলোর প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পাবে। সেইসঙ্গে বাঙালির খাদ্য তালিকায় আবারো ফিরবে এসব মাছ। তিনি বলেন, ব্যাপকভাবে চাষাবাদের ফলে মাছের উত্পাদন যেমন বাড়বে তেমনি দামও কমবে।
দেশের মাছের বাজারে অন্যতম স্থান করে আছে তেলাপিয়া। ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে দেশে আমদানিকৃত এই মাছের চাষ প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবে একসময় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরে বিএফআরআই এ মাছের চাষ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে। এখন দেশের দক্ষিণাঞ্চলের লোনাপানির ঘেরেও তেলাপিয়া চাষ হচ্ছে।
বছরে যুক্ত হবে ৪৩০০ কোটি অতিরিক্ত জাটকা
বিএফআরআই-এর গবেষণার ভিত্তিতে বরিশালের সদর উপজেলা (কালাবদর নদী), মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা (গজারিয়া নদী) ও হিজলা উপজেলার (মেঘনা নদী) মোট ৮২ কিলোমিটার এলাকাকে ইলিশের ষষ্ঠ অভয়াশ্রম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে বছরে প্রায় ৪,৩০০ কোটি অতিরিক্ত জাটকা ইলিশ নতুন করে যুক্ত হবে বলে ইনস্টিটিউটের গবেষকরা মনে করছেন। জাটকার প্রাচুর্যতা, পানির গুণাগুণ ও পানিতে প্ল্যাংটন (খাদ্যকণা) এর প্রাচুর্যতার ভিত্তিতে ইলিশের নতুন এই ষষ্ঠ অভয়াশ্রম নিশ্চিত করা হয়। উল্লেখ্য, ইনস্টিটিউটের গবেষণার ভিত্তিতে ইতোপূর্বে দেশে ৫টি অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
বর্তমানে ইলিশ উত্পাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে ১ম স্থানে রয়েছে। প্রতি বছর উত্পাদন করছে ৪ দশমিক ৯৬ লাখ টন। ষষ্ঠ অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার ফলে ইলিশ উত্পাদন এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত হবে বলে ইনস্টিটিউটের গবেষকরা মনে করছেন।
কৈ মাছের৭ ভ্যাকসিন
কৈ মাছের মড়ক প্রতিরোধে বিএফআরআই দেশে প্রথমবারের মতো ভ্যাকসিন উদ্ভাবন করেছে। ২০১৪ সালে সারাদেশে বিশেষ করে বৃহত্তর ময়মনসিংহ, নরসিংদী ও যশোর অঞ্চলের ৬০-৭০ শতাংশ ভিয়েতনামী কৈ এর খামারে মড়ক দেখা দেয়। অনেক চাষি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে গবেষণা করে কৈ মাছে স্ট্রেপটোকক্কাস এগালেকসি নামক ব্যাকটেরিয়াকে শনাক্ত করা হয়। তিন বছর গবেষণার পর ইনস্টিটিউটের গবেষকরা গতবছর স্ট্রেপটোকক্কোসিস রোগ নিয়ন্ত্রণে ভ্যাকসিন উদ্ভাবন করেন। উল্লেখ্য, কৈ মাছের রোগ প্রতিরোধে এটি দেশের প্রথম ভেকসিন উদ্ভাবন। শিগগির চাষিদের কাছে এ ভ্যাকসিন সহজলভ্য করা হবে।
মিঠাপানির ঝিনুকে মুক্তা উত্পাদন
ইনস্টিটিউটের একটি উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবন মিঠাপানির ঝিনুকে ইমেজ মুক্তা তৈরির কৌশল। এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, ৭ থেকে ৮ মাসেই ঝিনুকে ১টি পূর্ণাঙ্গ ইমেজ মুক্তা তৈরি করা সম্ভব। সাধারণত মোম, খোলস, প্লাস্টিক, ষ্টিল ইত্যাদি দিয়ে চাহিদা মাফিক তৈরিকৃত নকশাকে ঝিনুকের ম্যান্টাল টিস্যুর নিচে স্থাপন করে ইমেজ মুক্তা তৈরি করা হয়। ইমেজ মুক্তা উত্পাদনের পাশাপাশি দেশীয় ঝিনুকে (৬০-৭০ গ্রাম) নিউক্লি অপারেশনের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত কম সময়ে বড় ও গোলাকৃতির মুক্তা উত্পাদন করা সম্ভব হয়েছে। এসব প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদেরকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা সম্ভব হবে।
সামুদ্রিক মাছের পেপটাইড হতে খাদ্য উপাদান তৈরি
মাছের পেপটাইড একটি স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টি সমৃদ্ধ ফুড সাপ্লিমেন্ট। জাপানে সামুদ্রিক মাছের পেপটাইড একটি জনপ্রিয় ও স্বাস্থ্য সহায়ক খাদ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের সাগরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের মধ্যে পোয়া মাছে প্রোটিন ও সাদা মাংশপেশির পরিমাণ বেশি—যা পেপটাইড তৈরিতে অত্যন্ত উপযোগী। এ পরিপ্রেক্ষিতে ইনস্টিটিউটের গবেষকরা পোয়া মাছ হতে বাদামি রংয়ের পেপটাইড ট্যাবলেট তৈরি করেছে। বরিশাল ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে বর্তমানে পেপটাইড ট্যাবলেটের ট্রায়াল চলছে।
সী-উইড চাষ
সি-উইড পুষ্টি সমৃদ্ধ একটি খাদ্য। আমাদের দেশে খাবার হিসেবে এর জনপ্রিয়তা না থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ায় এর বিশাল বাজার রয়েছে। এ বিবেচনায় ইনস্টিটিউটের কক্সবাজার সামুদ্রিক মত্স্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্র বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন সি-উইডের চাষ প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। গবেষণা পর্যবেক্ষণে কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, বাকখালী মোহনা ও টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ এলাকায় এ পর্যন্ত প্রায় ৯১ প্রজাতির সি-উইডের সন্ধান পাওয়া গেছে। এরমধ্যে ১০ প্রজাতির সি-উইড বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন। ইনস্টিটিউট থেকে ৩ প্রজাতির সি-উইড সেন্টমার্টিন দ্বীপ, ইনানী ও বাকখালীতে চাষ করে প্রতি বর্গ মিটারে সর্বোচ্চ ৩০ কেজি পর্যন্ত উত্পাদন পাওয়া গেছে। এসব সি-উইড উন্নত খাদ্যমান ও ঔষধি গুণসম্পন্ন এবং মিনারেল সমৃদ্ধ— যা মানুষের বুদ্ধিমত্তার বিকাশ এবং শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ভেটকি ও চিত্রা মাছের পোনা উত্পাদনে গবেষণা চলছে
বর্তমানে ভেটকি মাছের পোনা উত্পাদনে গবেষণা চলছে। এছাড়া চিত্রা, দাতিনা, তপসে, কাইন মাগুরের পোনা উত্পাদন ও চাষাবাদের ওপর গবেষণা চলছে।
মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ ইত্তেফাককে বলেন, প্রযুক্তিভিত্তিক মাছচাষ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান, পুষ্টি চাহিদা পূরণে কাজ করছে ইনস্টিটিউট। ইনস্টিটিউট থেকে মত্স্য চাষ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ক ৬০টি লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বিলুপ্তপ্রায় অনেক প্রজাতির মাছ আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এ রকম বিলুপ্ত প্রজাতির আরো মাছ ফিরিয়ে আনতে কাজ চলছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মত্স্যখাতের আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন নতুন কর্মকৌশল প্রণয়নে ইনস্টিটিউট কাজ করছে।