হিসাব বিদ্যা, অঙ্ক ইত্যাদি নয় শুধু অর্থনীতি ও ব্যাংকিং-এও সংজ্ঞা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাক্ষরতার হার কত শিক্ষিতের হার কত এই প্রশ্নের উত্তরে নানা পরিসংখ্যান আসতে পারে যদি সংজ্ঞা পরির্বতন করা হয়। ‘লিখতে ও পড়তে পারে’ বললে এক ফল আসবে, আবার শুধু ‘দস্তখত করতে’ পারলেই সাক্ষরতার সংজ্ঞায় পড়বে বললেই সাক্ষরতার হার ভিন্ন রকম হবে। এই একই ব্যাপার ঘটে ব্যাংকিং এবং অর্থনীতিতেও। শ্রেণিবিন্যাসিত ঋণের পরিমাণ কত তা সংজ্ঞাভেদে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। সংজ্ঞা পরিবর্তন করে অবস্থার উন্নতি বা অবনতি দেখানো যায়। দারিদ্র্যের সংখ্যা কত, অতি দরিদ্র দেশে কতজন তা ভিন্ন ভিন্ন হবে সংজ্ঞা পরিবর্তন করলে। যুক্তি হচ্ছে এই সংজ্ঞা আমরা সচরাচর রদবদল করতে পারি না। এসবের নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হাতে। বিশ্বব্যাংক (ডব্লিউবি), আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), আন্তর্জাতিক সেটেলমেন্ট ব্যাংক (ব্যাংক অব ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্ট) ইত্যাদি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সংজ্ঞা তৈরি করে, বদলায়, এগুলোকে সময়োপযোগী করে। আমরা এসব অনুসরণ করি, করতে হয় কারণ আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অংশ। তুলনামূলক আলোচনা, তুলনামূলক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, তুলনামূলক শিক্ষার হার ইত্যাদি জানতে ও বুঝতে সারা বিশ্বই তা অনুসরণ করে।
দেশীয় ব্যবহারের জন্য নিজেদের যার যার সংজ্ঞা থাকতে পারে, এটা একান্তই নিজস্ব।এই যেমন আমরা আজ ‘নিম্ন-মধ্য আয়ের’ দেশে উত্তরণ লাভ করেছি। এটি হতে গিয়ে আমাদেরকে তিনটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখাতে হয়েছে। মাথাপিছু আয়, মানব সূচক এবং ভঙ্গুরতা—এই তিনটি সূচকে আমাদেরকে অগ্রগতি দেখাতে হয়েছে। তিনটির মধ্যে দুটোতে নিশ্চিত অগ্রগতি দেখাতে পেরেছি। একটার অর্থাত্ অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতায় একটু সামান্য টান আছে। ২০২১ সালে অর্থাত্ দুই বছর পর জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিল উত্তরণের জন্য সুপারিশ করবে; ২০২৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে তা চূড়ান্ত হবে। বলা বাহুল্য, কিছুটা সময় হাতে আছে। আমাদেরকে উন্নতি ধরে রাখতে উন্নয়নের গতি অব্যাহত রাখতে হবে— যাকে বলা হচ্ছে ‘টেকসই উন্নয়ন’ (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট)। তাহলে দেখা যাচ্ছে ‘স্বল্পোন্নত’ থেকে উন্নয়নশীল নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশ হতে বহু হ্যাপা। চাইলেই তা হচ্ছে না। শুধু ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধি দিয়ে তা হচ্ছে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানীয় জল প্রাপ্তি ইত্যাদি ক্ষেত্রেও আমাদের অগ্রগতি দেখাতে হয়েছে। সর্বোপরি, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকেও সাফল্য দেখাতে হবে। অর্থাত্ উন্নয়নের এক পর্যায়ে কোনো ‘দুর্ঘটনা’ উন্নয়নের স্তর থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নিচে নামাতে পারবে না। এটা অর্থনীতির ‘শক’ অ্যাবজরব করার ক্ষমতা যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
দেখা যাচ্ছে কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি। কিছুটা উত্তীর্ণ হয়েছি। সামনে অনেক পথ। সেই পথ পেরোতেই বহু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি দিয়ে হবে না। বলা হচ্ছে যে ৯টি দেশ এ বছরে ৭ শতাংশের উপরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে। এর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এর চেয়ে আনন্দের খবর আর কী হতে পারে। তবে ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির সঙ্গেই জড়িয়ে আছে বৈষম্য, অর্থনৈতিক ও আয় বৈষম্য। এই ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতির আরও অনেক সুযোগ আছে। দেখা যাচ্ছে দেশে ‘অতি ধনীর’ সংখ্যা বাড়ার প্রবণতা বিশ্বের মধ্যে প্রথম এবং ‘ধনীর’ সংখ্যা বৃদ্ধির হারে তৃতীয়। লোক ধনী হবে, অতি ধনী হবে এতে কারো আপত্তি থাকার কথা নয় যদি তারা আইন মেনে এটা করে। দ্বিতীয়ত, যদি পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা না বাড়ে।
অতি দরিদ্র ও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে এবং পাশাপাশি বৈষম্য বাড়তে থাকলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। অথচ ‘টেকসই উন্নয়নের’ (এসডিজি) ওপর নির্ভর করছে আমাদের নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে চূড়ান্ত স্বীকৃতি। এর জন্য বাজার দরকার, মধ্যবিত্ত দরকার। বৈষম্য কমানো দরকার। তা না হলে অর্থনীতির বাজার বিঘ্নিত হবে। ভোগ বিঘ্নিত হবে। শুধুমাত্র বিদেশি বাজার দিয়ে, ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির বর্তমান হার রক্ষা করা যাবে না। অথচ দেখা যাচ্ছে ‘নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে’ রূপান্তরিত হওয়ার ফলে আমাদের অনেক অঙ্ক আমাদের প্রতিকূলে পরিবর্তিত হবে। যেমন ‘দরিদ্র’ এবং ‘অতি দরিদ্রে’র পরিসংখ্যান। বিশ্ব ব্যাংকের “দারিদ্র্য ও প্রাচুর্য ভাগাভাগি ২০১৮” অনুসারে আমাদের ‘অতি দরিদ্রের’ সংখ্যা মারাত্মকভাবে বেড়ে যাবে। অবশ্যই এটা ‘সংজ্ঞা’ পরিবর্তনের ফলে যার কথা নিবন্ধের শুরুতেই উল্লেখ করেছি। ‘গরিব দেশ’ এবং ‘উন্নয়নশীল দেশের’ ক্ষেত্রে ব্যবহূত সংজ্ঞা ভিন্ন ভিন্ন। এর ফলেই এটি ঘটবে। বর্তমানে দেশে সরকারি হিসাবে ‘অতি দরিদ্রের’ সংখ্যা মাত্র ২ কোটি ৪১ লাখ। এটা ‘পিপিপি ডলার’ (পার্চেজিং পাওয়ার প্যারিটি)-এর হিসাবে কেমন দাঁড়ায়। বর্তমানে এক দশমিক ৯০ ‘পিপিপি ডলারের’ নীচে দৈনিক আয় হলেই সেই ব্যক্তি অতিদরিদ্র বলে পরিচিত হবে। কিন্তু ‘নিম্ন-মধ্যম’ হওয়ার ফলে ঐ সংজ্ঞা আর কার্যকর থাকবে না। পরবর্তীকালে দৈনিক পিপিপি ডলার তিন দশমিক ২-এর কম হলে তিনি হবেন ‘অতি দরিদ্র’। এই হিসেবে ‘অতি দরিদ্র’ হবে আমাদের ৮ কোটি ৬২ লাখ। বিশাল উল্লম্ফন।
বাংলাদেশে ‘পিপিপি’ হিসেবে ডলারের দাম হয় ৩২ টাকা ৫০ পয়সা। বাজারে তা ৮৪ টাকার মতো। অর্থাত্ এক ডলারে ইউরোপ ও আমেরিকায় যে পরিমাণ পণ্য ক্রয় করা যায়, বাংলাদেশে সেই পরিমাণ পণ্য ক্রয়ে লাগার কথা এক ডলারই। কিন্তু বাস্তবে লাগে মাত্র সাড়ে বত্রিশ টাকা। তার মানে ‘পিপিপি’ পদ্ধতিতে (ক্রয়ক্ষমতার সমতার ভিত্তিতে) এক ডলার সমান বত্রিশ টাকা পঞ্চাশ পয়সা। এই হিসেবে ‘অতি দরিদ্র’ তারাই হবে যারা বাংলাদেশে দিনে তিন দশমিক দুই ডলারের কম রোজগার করবে। এ সবই বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব। এই হিসাবগুলো আগামীদিনে আরো পরিষ্কার হবে। পরিষ্কার হবে তখনই যখন বিশ্ব ব্যাংক এসব তথ্য ব্যবহার করা শুরু করবে, আমাদের পরিকল্পনা কমিশন ব্যবহার শুরু করবে। যখনই হিসাব করা হোক এই নতুন হিসাবে ‘দরিদ্র এবং অতিদরিদ্রের’ পরিসংখ্যানটি হবে খুবই হতাশাজনক। হঠাত্ মনে হবে আমরা ‘দারিদ্র্য’ কমালাম এত বছর চেষ্টা করে, এখন বলা হচ্ছে তা কমেনি বরং বেড়েছে। এটা কীভাবে সম্ভব? সম্ভব সংজ্ঞা বদলের কারণে। সম্ভব আমাদের ‘স্ট্যাটাস’ বদলের কারণে। এই অবস্থার জন্য আমাদেরকে প্রস্তুত থাকতে হবে। প্রস্তুত না শুধু এই প্রতিকূল পরিসংখ্যান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমাদের সাধারণ মানুষের আয় অতি দ্রুত বাড়াতে হবে। এখানে শৈথিল্যের কোনো স্থান নেই। অনেক রকমের বিপ্লবের কথা আমরা জানি এবং বলি (শিল্প বিপ্লব, কৃষি বিপ্লব) ইত্যাদি ইত্যাদি। এবার দরকার হবে ‘আয় বিপ্লব’ (ইনকাম রিভোলিউশন)। বর্তমান চিত্রটি আশাব্যঞ্জক নয়। আমাদের মানুষের ইনকাম বাড়বে। এই তথ্য নিয়মিত আমরা পাই। কিন্তু যা নিয়মিত পাই না তা হচ্ছে আয়ের হিসাব। প্রকৃত মজুরি বা আয়ের হিসাব দরকার। মূল্যস্ফীতি বাদ দিয়ে আয়ের হিসাব। এই দুটোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করলে আয়ের পাল্লা ভারী হবে না, ভারী হবে খরচের পাল্লা। এই প্রবণতা রোধ করতে হবে। প্রকৃত মজুরি ঠিক রাখা নয়, বরং বাড়াতে হবে। তাহলেই খরচও চলবে, সঞ্চয়ও হবে।
সঞ্চয় ছাড়া আমাদের চলবে না। আমরা আমেরিকা বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশ নই। সেখানে পরিবার বিলুপ্ত হচ্ছে। পরিবারের স্থান নিচ্ছে রাষ্ট্র। দুর্দিনে দেখাশুনা, বেকারত্বে দেখাশুনা, চিকিত্সা খরচ বহন, ইত্যাদি কাজ করে রাষ্ট্র নতুবা বড় বড় কর্পোরেশন। ধনাঢ্য ব্যক্তিরা। আমাদের দেশে তা নয়। মধ্যবিত্তকে নিজে চলতে হয়, আত্মীয়-স্বজন টানতে হয়, বেকার ভাই-বোনকে দেখতে হয়। বৃদ্ধ বাবা-মাকে দেখতে হয়, চিকিত্সার খরচ বহন করতে হয়। এসব উন্নত দেশে করতে হয় না মধ্যবিত্তকে। এমতাবস্থায় আমাদের মধ্যবিত্তকে সঞ্চয়ে উত্সাহিত করতে হবে। মধ্যবিত্তের সংখ্যা বাড়াতে হবে। মধ্যবিত্ত যাতে নিম্নবিত্ত না হয়। নিম্নবিত্ত যাতে গরিব না হয়, গরিব যাতে অতি গরিব না হয় তা দেখতে হবে রাষ্ট্রকেই। আমি মনে করি এখন থেকে সরকারের উচিত হবে ‘জাতীয় আয়’ বাড়ানোর পাশাপাশি আয় বর্ধনেরও ব্যবস্থা করা। বৈষম্যবিরোধী শক্ত পদক্ষেপ দরকার। আইনের মধ্যে থেকে যাতে মানুষ টাকা বানায় তা দেখতে হবে। বিদেশে পাচারকৃত টাকা দেশে এনে তা জনকল্যাণে বিনিয়োজিত করা যায়। এসবই আজকের দিনের চ্যালেঞ্জ।
n লেখক: অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়