লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে বিএনপি নাখোশ

আসন্ন নির্বাচন ঘিরে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমতল ক্ষেত্র না হওয়া নিয়ে অসন্তোষ বিরাজ করছে বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে। দলের নেতারা বলছেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি না হলে এবং চলমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তারা নির্বাচনে যাবে কি না সে নিয়ে যথাসময়ে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে বাধ্য হবে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক। তফসিল ঘোষণার পর আমরা আশা করেছিলাম গ্রেফতার, মামলা, রিমান্ড, হয়রানি বন্ধ হবে। কিন্তু এখনো একই অবস্থা চলছে। এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনে আমরা প্রতিনিয়ত কথা বলছি। কিন্ত কোন লাভ হচ্ছে না। তিনি বলেন, আমরা টিকে থাকার চেষ্টা করছি। কিন্তু সরকার চায় কি না আমরা নির্বাচন করি, সেটিই বড় প্রশ্ন। তাঁর মতে, গায়েবি মামলা প্রত্যাহার এবং গ্রেপ্তার আতঙ্ক দূর না হওয়া পর্যন্ত সুষ্ঠু নির্বাচনের সমতল পরিবেশ তৈরি হবে না। গত বুধবার নয়াপল্টনে পুলিশের সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনাকে ফখরুল ষড়যন্ত্র ও উসকানি বলেও মন্তব্য করেন।

ইসিকে চিঠি, সিইসিকে ফোন: গতকাল উদ্বেগ প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়েছেন মির্জা ফখরুল। তার আগের দিন তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার নুরুল হুদাকে ফোন করে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, তফসিলের পর কেন আমাদের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে? বুধবার নয়াপল্টনে আমাদের অফিসের সামনে পুলিশের হামলার পর আপনি দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু যাদের ছবি পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে তাদের আটক করা হয়নি। উল্টো আমাদের দলের নীরিহ নেতা-কর্মীদের টার্গেট করে মামলা দিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। এগুলো বন্ধ করেন। এসব অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে শুধু অন্তরায় নয়, প্রচণ্ড বাধা। এমন অবস্থা চলতে থাকলে নিরপেক্ষ নির্বাচন অসম্ভব। তিনি সিইসিকে আরো বলেন, আওয়ামী লীগ চার দিন ধরে উত্সব করল; অথচ বিএনপি করলেই বলা হচ্ছে এটা করা যাবে না, আচরণবিধি লঙ্ঘন। নুরুল হুদা মির্জা ফখরুলকে আশ্বস্ত করে বলেন, আমরা এখন থেকে এগুলো  দেখবো। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড যাতে কার্যকর করা যায় তা সে বিষয়ে আমরা চেষ্টা করছি।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর দলের যে ৪৭২ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের তালিকা দিয়ে গতকাল বিএনপির পক্ষ থেকে ইসিকে দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে ফখরুল লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দেওয়া বানোয়াট মামলা প্রত্যাহারসহ গ্রেফতার নেতাকর্মীদের নিঃশর্ত মুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে কমিশনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

জোটের শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি ও ২০ দলীয় জোটের সমন্বয়ক কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, ‘সরকার এবং নির্বাচন কমিশন নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বলে। কিন্তু বাস্তবে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী, এমপি-মন্ত্রী এমনকি প্রধানমন্ত্রী সারাদেশে কয়েক মাস ধরে সরকারি ব্যয়ে নৌকার পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। অন্যদিকে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপির চেয়ারপারসন, তিন বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগে কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। হাইকোর্ট তাকে জামিন দিলেও সরকারি প্রভাবে নিম্ন আদালত তাকে জামিন না দেওয়ায় তিনি মুক্ত হয়ে নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছেন না। এটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড এর ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত।

কর্নেল অলি আহমদ আরো বলেন, জাতীয় রাজনৈতিক দল ও জোটের সাথে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী কথা দিয়েছিলেন যে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর কোনো রাজনৈতিক মামলা দেওয়া যাবে না, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করা হবে না এবং গায়েবি ও মিথ্যা মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো তিনি একথা বলার পরেও শত শত রাজনৈতিক ও গায়েবি মামলা হয়েছে এবং হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে আসামি করে ঘর-বাড়ি ছাড়া করা হয়েছে। কোনো মামলা প্রত্যাহার হয়নি, কোনো রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ছাড়া পায়নি।

কয়েকদিন আগে দলের গুলশান অফিসে বিদেশি কূটনীতিকদেরও বিএনপি নেতারা জানান, তাদের দল ও জোট গণতন্ত্রের জন্য নির্বাচনে যোগ দিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে সরকার ও নির্বাচন কমিশন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে কোনো পদক্ষেপ নেয় নি।

‘নির্বাচন কমিশন এখন আওয়ামী লীগ ভবন’: গতকাল শুক্রবার রাজধানীর নয়াপল্টন বিএনপির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচন কমিশন ভবন আওয়ামী লীগের অফিসে পরিণত হয়েছে। আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন ভবনে সরকারি দলের লোকজনদের অবাধ বিচরণ ঘটছে। আওয়ামী লীগের নির্দেশেই পরিচালিত হচ্ছেন নির্বাচন কমিশনের কিছু কর্মকর্তা। তিনি বলেন, সরকারের নির্দেশ প্রতিফলনের জন্য নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত নির্বাচন ভবনে অফিস করছেন আওয়ামী লীগের নির্বাচন বিষয়ক উপ-কমিটির এক সদস্য। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করছেন তিনি। তার ভয়ে তটস্থ নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন স্তরের মেধাবী কর্মকর্তারা। তবে নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালউদ্দিন আহমদ নানাভাবে তাকে সাহায্য সহযোগিতা করে থাকেন   বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি আরো বলেন, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হলেও এখন পর্যন্ত মন্ত্রী-এমপিরা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানসহ নানা অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন, বক্তব্য রাখছেন। নির্বাচন কমিশন থেকে কোন ধরণের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।