আমাদের সমাজের মূল্যবোধগুলো খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখনকার চালু আচরণ হচ্ছে—ইংরেজিতে যাকে বলে ‘রাফ অ্যান্ড টাফ’, আর বাংলায় ‘চাঁছাছোলা দুর্মুখ’। সুবোধ, শান্ত অথচ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী জেনারেশন এখন সমাজ থেকে উধাও। এখন ঘাড়ত্যাড়া, টেটিয়া, একরোখা, রাগী মানুষরা সমাজে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের প্রধান আদর্শ ও লক্ষ্য হচ্ছে, নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ। কোনো রকম বাধার সম্মুখীন হলেই তারা খেঁকিয়ে ওঠে : ‘আমাকে চিনিস?’ অথবা ‘জানিস, আমি কে’।
গোটা দুনিয়া জুড়েই এখন এই শ্রেষ্ঠত্ব, অহমিকা আর আস্ফাালন: ‘আমাকে চিনিস? আমার সঙ্গে বেশি তেড়িবেড়ি করলে বাপের নাম ভুলিয়ে দেব!’ কোথাও কোনো শিষ্টাচার নেই। ভদ্রতা নেই। একটা বেপরোয়া ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ সবখানে। গোটা পৃথিবী কাঁসার বাসনের মতো ঝনঝন করে বাজছে। চিকিত্সক, পুলিশ, প্রকৌশলী, আমলা, চামার-কামার, সুশীল, মন্ত্রী, আলেম, জঙ্গি-সবাই ষণ্ডা-গুন্ডার মতো আচরণ করছে। যে যার মতো ক্ষমতা দেখানোর চেষ্টা করছে। ভিলেনদের মতো ‘দেখে নেব’ বলে হুংকার ছাড়ছে।
বেশির ভাগ মানুষের মধ্যে ন্যূনতম সহনশীলতা নেই। কেবল হুমকি-ধমকি, ‘দেখে নেব’ বলে শাঁসানো, গালাগাল। এরাই এ যুগের বীর-হনুমান। এদের থিম হলো, দুনিয়াটাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলা, সপাটে, স-ডাঁটে চলা। চাঁছাছোলা ভাষা ব্যবহার, দুর্বিনীত দুর্মুখ হওয়াই এখন স্মার্টনেসের ঝলমল পতাকা। মানুষও এখন অভদ্রতার তুমুল ফ্যান।
আগে নিরক্ষর, বঞ্চিত, বৈষম্যকবলিত বস্তিবাসী, শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে চিত্কার করে কথা বলা, নোংরা ভাষা প্রয়োগ, তুচ্ছ কারণে ঝগড়া বা গালাগাল করার প্রবণতা দেখা যেত। এখন সেটা সব শ্রেণিপেশার মানুষের মধ্যে সম্প্রসারিত হয়েছে। এখন কারো মুখের ভাষা বা আচরণ দেখে বোঝার উপায় নেই, সে শিক্ষিত না নিরক্ষর। কারোর মধ্যে ব্রেক নেই, বেল নেই, নিয়মনীতি-শিষ্টাচারের বালাই নেই। আছে শুধু হুংকার, খেপিয়ে দেওয়া, চটে যাওয়ার প্রবণতা।
একসময় আমাদের দেশে প্রচলিত একটি কথা ছিল, ব্যবহারে বংশের পরিচয়। অর্থাত্ ভালো বংশের মানুষ খারাপ আচরণ করতে পারে না। এখনকার মানুষ অবশ্য বংশ, বংশপরিচয়ের মতো ‘ঔপনিবেশিক’ ধ্যানধারণায় বিশ্বাস করে না। কেউ কেউ ‘ব্যবহারে বংশের পরিচয়’ বাক্যটির সংশোধনী এনেছেন। তাদের মতে, ব্যবহারের সঙ্গে বংশের কোনো সম্পর্ক নেই। একই বংশের মধ্যে ভালো-খারাপ উভয় ব্যবহারের উভয় চরিত্রের মানুষ জন্ম নিতে পারে। চরিত্র, ব্যবহার এগুলো সম্পূর্ণই নিজস্ব চিন্তাভাবনা, বিবেক, নীতি-নৈতিকতার ওপর নির্ভর করে। আর আধুনিক পৃথিবীতে বংশ-টংশ এসব নিয়ে মানুষ এত ভাবতে চায় না। বর্তমান যুগ সম-অধিকারের যুগ। এ যুগে বংশ নিয়ে কথা বলতে গেলে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের রোষানলে পড়ার আশঙ্কা আছে। পারিবারিক বিয়ে ছাড়া অন্য কোথাও এখন আর বংশের তেমন কদর নেই। তাই সংশোধিত বাক্যটিতে বলা হচ্ছে : ব্যবহারে মানুষের পরিচয়। আপনার ব্যবহার জানিয়ে দেবে আপনি কেমন ধরনের মানুষ। আপনি যদি প্রকৃত শিক্ষিত বা জ্ঞানী হন বা আপনার মধ্যে যদি মনুষ্যত্ব নামক কিছু থাকে, তবে আপনি বিনয়ী হবেন; আপনার আচরণ মার্জিত হবে। আর আপনি যদি অশিক্ষিত, বর্বর বা অমানুষ হন, তাহলে আপনি উগ্র হবেন, যেখানে সেখানে বেয়াদবি করবেন, নিজেকে বেশি চালাক মনে করবেন, নিজেকে সেরা মনে করবেন, আপনার মধ্যে একটা ড্যাম কেয়ার ভাব থাকবে, এমনকি রাস্তাঘাটে চিত্কার করে কথা বলে মানুষজনকে একত্র করতে আপনার এতটুকু সংকোচ বোধ হবে না। কারণ ওই জ্ঞান আপনি অর্জন করেননি, ঐ বোধশক্তি আপনার কাছে নেই।
অনেকে এর জন্য পারিবারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাদের মতে, পরিবার হচ্ছে মানুষ তৈরির কারখানা। পরিবারেই মানবশিশুর জন্ম হয়, বিকশিত হয় এবং ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ মানুষে পরিণত হয়। পরিবারেই ভালো মানুষের জন্ম হয়, আবার খারাপ মানুষের জন্ম হয়। পরিবারেই রাষ্ট্রনায়কদের জন্ম হয়, আবার সভ্যতাধ্বংসকারী নরপিচাশের জন্ম হয়। এই যে ভালো-মন্দের পার্থক্য, তা গড়ে দেয় যে বিষয়টি, তা হলো পারিবারিক শিষ্টাচার। শিষ্টাচার কী? মানুষের আচার-আচরণ, কথা, বার্তা, কার্যকলাপ, ভাববিনিময় ইত্যাদি সুন্দর ও মার্জিতরূপে প্রকাশিত হওয়াই শিষ্টাচার। শিষ্টাচার হলো মানুষের চরিত্রের অলংকার।
আমাদের ছোটবেলায় মা-বাবা-শিক্ষক-শিক্ষিকা সবাই শিষ্টাচারের ওপর খুব গুরুত্ব আরোপ করতেন। কারও বাসায় বেড়াতে যাওয়ার সময় মা সতর্ক করে দিয়ে বলতেন, ‘সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে, বড়দের সম্মান করবে, ছোটদের আদর করবে।’ শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক আদব-কায়দা-আচরণ সমপর্কে পরামর্শ দিতেন। নখ লম্বা, কাপড় ময়লা কি না তাও দেখতেন। ব্যতিক্রম দেখলে বকা দিতেন। শাস্তিও দিতেন। দুঃখের বিষয়, সে নিয়ম ও রীতি যেন আজকাল আর নেই। সব উঠে গেছে। আজকাল উগ্র ব্যবহার করাকে অনেকে আধুনিকতা বা ফ্যাশন মনে করে থাকেন।
শুধু উগ্র ব্যবহার নয়, একে অন্যকে অপমান-অপদস্থ করতে না পারলেও যেন এখনকার মানুষ শান্তি পান না। অবশ্য সবার মান-অপমানবোধ সমান নয়। এমন অনেক লোক আছেন যাদের গায়ের চামড়া খুব পুরু এবং চোখের চামড়া নেই, তাদের চেষ্টা করেও অপমান করা যায় না। আবার একধরনের লোক আছেন, যারা কারণে-অকারণে হঠাত্-হঠাত্ই অপমানিত বোধ করেন।
আবার কিছু সরল প্রকৃতির লোক আছেন, তারা অপমানিত হলেও বুঝতে পারেন না। তাদের যে আত্মসম্মানবোধ নেই, তা কিন্তু নয়। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বাঁকা কথা বললে এরা ধরতে পারেন না। আকারে-ইঙ্গিতে এদের অপমান করা যায় না। তবে তারা যদি বুঝতে পারেন যে, অপমানিত হয়েছেন কিংবা কেউ তাকে অপমান করেছেন, তখন রীতিমতো ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েন। মান-অপমান বিষয়ে একটা পুরোনো গল্প উল্লেখ করা যেতে পারে। গল্পটি পুরোনো, সেই ‘সাধু ভাষা’র আমলের।
গরিব বাড়ির একটি অল্পশিক্ষিত ছেলে এক নব্য বড়লোকের বাড়িতে কাজের জন্য নিযুক্ত হয়েছে। তার কাজ ছিল ফুট-ফরমায়েশ খাটা, এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করা। কিন্তু এই ধনীগৃহের লোকজন বড় বেশি সুবিধার ছিল না। তারা কারণে-অকারণে নানারকম ছুতো ধরে সেই গরিব ছেলেটির ওপর অত্যাচার চালাত। গরিব ছেলেটির কোনো উপায় ছিল না বলে মুখ বুজে সব অপমান-অত্যাচার সহ্য করত।
ছেলেটি একদিন তার এক বন্ধুর কাছে একটি চিঠি লিখেছিল। ‘অপমান শাস্ত্রের’ ইতিহাসে এটাকে চরমপত্র বলা যায়। চিঠিটির উল্লেখযোগ্য অংশ এরকম :
‘প্রিয় খগেন,
আজ দেড় মাস হইল চৌধুরী বাড়িতে কাজ করিতেছি। এই চৌধুরীরা যেমন বড়লোক, তেমনই ছোটলোক। ইহাদের টাকাপয়সার, অর্থের অভাব নাই। কিন্তু লোকের সঙ্গে বিশেষত বাড়ির কাজের লোকের সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ ব্যবহার করে, এমনকি মারধর করে। বিশেষ কী বলিব, কয়েক দিন আগে বাজার হইতে আসিতে দেরি হওয়ায় ছোটসাহেব লাথি মারিলেন। গতকাল পানি দিতে দেরি হওয়ায় মেজসাহেবা ‘শুয়োরের বাচ্চা’ বলিলেন, আজ কাঁচের গেলাস ভাঙিয়া ফেলায় বড়সাহেব জুতা মারিলেন।
আমার এখন ভয় হইতেছে, ইহারা আমাকে না জানি কোনোদিন অপমান করিয়া বসিবে। অপমান আমার সহ্য হইবে না, তখন কাজ ছাড়িয়া দিতে বাধ্য হইব।
—ইতি
তোমার হতভাগ্য বন্ধু
নগেন’
আমাদের দেশে যারা নম্র-ভদ্র, মান-ইজ্জত বিষয়ে যারা সচেতন ও সতর্ক, তারা সব রকম বিরোধ-বিসম্বাদ এড়িয়ে চলেন, কোনো রকম ঝামেলায় না জড়িয়ে কীভাবে মান বাঁচিয়ে চলা যায়, সমাজে টিকে থাকা যায়, সেই ‘আর্ট’ প্রতিনিয়ত চর্চা করেন। সচরাচর কোনো ভদ্রলোককে মান রক্ষার জন্য আদালতের দ্বারস্থ হতে দেখা যায় না। মান-ইজ্জত নিয়ে কোথাও কখনো আশঙ্কা দেখা দিলে মানে মানে কেটে পড়ার চেষ্টা করেন। অনেকে বিরোধ-বিতর্ক এড়িয়ে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পালিয়ে হলেও মান বাঁচানোর চেষ্টা করেন।
এখন অবশ্য চিত্র বদলেছে। এখন অশিষ্ট বেয়াদবদেরই একচেটিয়া রাজত্ব। দুর্ব্যবহারকে এখন বলা হয় ‘মেরুদণ্ড’ সোজা করে চলা, অশ্লীল আত্মবিজ্ঞাপনকে এখন বলে মার্কেটিং, অন্যকে অনর্গল অপমান করার প্রবণতাকে বলে সপ্রতিভতা, হিংসা ও আঘাত করবার অভ্যাসকে বলে আগ্রাসন। জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই, সকল নম্রতা, বিনয়, অন্যকে সম্মান দেবার রীতি ভুলে, বেহায়াপনা ও অশিষ্টতার চূড়ান্ত প্রদর্শন এখন সামাজিক রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভালো ব্যবহার, ভালো আচরণ করলে কিন্তু নিজের শ্রেষ্ঠত্ব কমে না। বরং তাতেই নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পায়। সমস্যা হলো, এখন এটা কাউকে বোঝানো যায় না। কারণ এখন বেশির ভাগ মানুষ নিজেকে সবজান্তা শমসের বা একটা হনু মনি করে। আপনি যদি মনে করেন যে আপনিই একমাত্র শ্রেষ্ঠ, সকল বিষয়ে আপনার ব্যাপক দক্ষতা, যোগ্যতা, তাহলে আপনাকে বোঝাবে, এমন সাধ্য কার বাবার আছে?
n লেখক : রম্য রচয়িতা