রাজধানীর বর্তমান আর্থসামাজিক অবস্থা পর্যালোচনা করলে বোঝা যাবে আমরা উন্নয়নের কোন পর্যায়ে আছি। বাংলাদেশের মোট অভ্যন্তরীণ উত্পাদনের (GDP) মাত্র ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ Share করে বিদ্যুত্, গ্যাস ও পানির ক্ষেত্রে (Economic Trends, August 2020)। অপর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশন, পানি ও বায়ুদূষণের মতো পরিবেশগত সমস্যার কারণে অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বছরে ৪ দশমিক ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (Flagship Report on Economic Impacts of Inadequate Sanitation in Bangladesh :Water and Sanitation Program 2012, ADB, Australian Aid)। সুতরাং নাগরিক উপযোগগুলোর যথাযথ ব্যবস্থাপনা রাজধানীর আর্থসামাজিক অবস্থাকে অনেকাংশে প্রভাবিত করে। অন্যদিকে রাজধানীর নাগরিক উপযোগের সুবিধা প্রদানের অন্যতম দায়িত্ব ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) ছাড়াও ঢাকা বিদ্যুত্ বিতরণ কর্তৃপক্ষ, তিতাস গ্যাস এবং ঢাকা ওয়াসাসহ অন্যান্য সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত। মূলত ঢাকা শহরের ব্যবস্থাপনার অনেকাংশ দায়িত্ব ঢাকা সিটি করপোরেশনের ওপর, তাই এর গুরুত্বও অনেক। অন্যদিকে ঢাকা সিটি করপোরেশন ঢাকা মহনগরীরই একটি অংশ। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এলাকা অনুযায়ী ঢাকার বর্তমান আয়তন ৩৬০ বর্গ কিলোমিটার এবং লোকসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ (সূত্র :ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং আদমশুমারি ২০১১ রিপোর্ট)। অর্থাত্, প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৩৬ হাজার ১১১ জন লোক বাস করে। পানির প্রাপ্যতা, পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা, জ্বালানি গ্যাস, রাস্তাঘাট, বিদ্যুত্সহ প্রায় সব নাগরিক সুবিধা সরবরাহও বর্তমানে ঢাকার জনসংখ্যার চাহিদার চেয়ে অপ্রতুল।
চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের ব্যবধানটা সব সময়ই বাড়ছে এবং প্রতিনিয়ত জনসংখ্যার চাপ ঢাকা আর সহ্য করতে পারছে না। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা শহরের বিভিন্ন নাগরিক সুবিধার মধ্যে ভাগের পরিমাণ বা অংশীদার বেড়ে গেছে, কিন্তু সেই অনুপাতে নাগরিক সুবিধা বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। যেহেতু Service oriented public sector-গুলোকে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর আস্থা রাখতে হয়, তাই এর কেন্দ্রীয় সরকারের মতামতের ওপর নির্ভর করতে হয়। এছাড়া অল্প আয়ের লোকজনের ওপর সরকার কোনো করও ধার্য না করতে পারায় জনসংখ্যার অনুপাতে রাজস্ব আয় হচ্ছে না। ফলে সঠিক সেবা দেওয়ার জন্য যে আয় দরকার, তা আদায় হচ্ছে না। তাই চাহিদা ও সরবরাহের (Demand & Supply) মধ্যে পার্থক্য বাড়ছেই।
রাজধানী ঢাকার সামাজিক পরিবেশের একটি বড় সমস্যা হচ্ছে ছিন্নমূল ও বস্তিবাসীর সমস্যা। ঢাকায় প্রায় ৫ হাজার বস্তিতে ৪০ লাখ লোক বাস করছে (সূত্র :MICS2016, UNICEF) এবং সেখানে বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় (রাস্তা, পানি, বিদ্যুত্, গ্যাস ইত্যাদি) সব সুযোগ-সুবিধাই অপ্রতুল এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। সামাজিক নানা সমস্যার বেড়াজালে এই বিশাল জনগোষ্ঠী সামগ্রিকভাবে মহানগরীর অন্যান্য জনগণের সঙ্গে সমানভাবে সমস্যার অংশীদার। এই বস্তিগুলোর অধিকাংশ মানুষ প্রধানত আয়ের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকা শহরকে বেছে নিয়েছে গন্তব্য হিসেবে। অন্যভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ৪০ লাখ লোক প্রতিদিন যে নাগরিক সুবিধা (রাস্তা, বিদ্যুত্, পানি ইত্যাদি) গ্রহণ করে, তাতে সেবা প্রদানকারী সংস্থার কোনো আয় হয় না, ফলে এই জনগোষ্ঠী ঢাকার জন্য বাড়তি চাপ হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে এই জনগোষ্ঠীর বাস্তবিক পুনর্বাসন না করে এদের উচ্ছেদ করাকে অনেকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে আখ্যায়িত করেন। বস্তি উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে ঢাকা সিটি করপোরেশন ১৯৯৪ সালে ‘বাস্তি উন্নয়ন অধিদপ্তর’ নামে একটি প্রকল্প শুরু করে, যার দায়িত্ব হচ্ছে ঢাকার বস্তির জীবন যাপনের মান উন্নয়ন করা। এই প্রকল্পের আওতায় চাক্ষুষ কোনো উন্নয়ন দেখা না গেলেও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও ইউনিসেফের সহায়তায় ঢাকা সিটি করপোরেশন কিছু বস্তিকে এই প্রকল্পের আওতায় ট্রেনিং এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে খাদ্য সরবরাহ করে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত পুনর্বাসন ছাড়া এ ধরনের সহযোগিতা ঢাকার বস্তি উন্নয়নে কতটুকু টেকসই সেটা বিবেচনার বিষয়। কারণ ঢাকায় বস্তি ও বস্তিবাসীর সংখ্যা দুটোই সমানতালে বাড়ছে। ফলে সাময়িক কিছু সুবিধা দেওয়া থেকে পরিকল্পিত ও বাস্তবিক পুনর্বাসন করাই টেকসই উন্নয়নের জন্য সমীচীন পদক্ষেপ হবে বলে মনে করেন।
ঢাকার সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করলে আপাতদৃষ্টিতে দেখা যায় গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। যদিও আয়ের ব্যবধান অনেক বেশি। দারিদ্র্য বাড়ছে, যার ফলে দরিদ্রও বাড়ছে। বিবিএসের সর্বশেষ প্রাক্কলন অনুযায়ী বাংলাদেশের ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার ২০ দশমিক ৫ শতাংশ (সূত্র :বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২০), যা অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করে সামাজিক অবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। সামাজিক অবনতির কারণে মানুষের স্বভাব ও চরিত্রের পরিবর্তন ঘটে, যার ফলে বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবনতির কারণে পরিবেশের অবক্ষয় হচ্ছে।
উন্নয়নের সম্ভাব্য পদক্ষেপ : উপর্যুক্ত প্রতিটি অবস্থার জন্য ঢাকা শহরকে একটি সঠিক শহর উন্নয়নের এবং জনসংখ্যার চাপ কমিয়ে উপর্যুক্ত বিষয়গুলোকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এর জন্য একটি প্রধান পদক্ষেপ হওয়া উচিত ঢাকা শহরের জনসংখ্যার সঠিক বণ্টন। অধিক লোকসংখ্যাই ঢাকার যথাযথ কর্তৃপক্ষ নিয়োজিত থাকা সত্ত্বেও ঢাকার বর্তমান অবস্থা তাদের ব্যবস্থাপনার বাইরে। ফলে বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে উপলব্ধি করা যায়, হয়তো নাগরিক সুবিধা প্রদানকারী সংখ্যাগুলোর ব্যবস্থাপনার কোথাও ঘাটতি রয়েছে, শহরের চাহিদার সঙ্গে সংস্থাগুলোর সামর্থ্য কম।
বস্তুত, রাজধানীর উন্নয়ন একটি দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ধনাত্মক অবদান রাখতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর পরিবেশের উন্নয়নও সামগ্রিক উন্নয়নের অংশ। আসলে পরিবেশের উন্নয়ন কোনো আলাদা ধরনের উন্নয়ন নয়। সুষ্ঠুভাবে জীবনযাপনের জন্য পরিকল্পনা মাফিক বর্তমান অবস্থার ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনের তাগিদে উন্নয়নই পরিবেশের উন্নয়ন হতে পারে।
n লেখক :উন্নয়ন গবেষক ও গবেষণা
পরিচালক, ডর্প