এক সময়ের খোরপোষের কৃষি এখন বাণিজ্যিক কৃষিতে পরিণত হচ্ছে। বিজ্ঞানের সাফল্যের কারণে মৌসুমভিত্তিক চাষাবাদে এসেছে পরিবর্তন, অনেক ফসল এখন সারা বছরই চাষ হচ্ছে। দেশি ফলমূলের সঙ্গে দেশের নানান প্রান্তে চাষ হচ্ছে বিদেশি ফল। তৈরি হচ্ছে কৃষি উদ্যোক্তা। আদতে আমরা এখন কৃষির সুবর্ণ সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। প্রযুক্তির উত্কর্ষ আর বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদের মাধ্যমে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিচ্ছে দেশের শিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠী। তবে এই উদ্যোক্তাদের সংখ্যা এখনো আশানুরূপ নয়।
দেশে শিক্ষিত বেকার সংখ্যা ২৫-৩০লাখ, উপরন্তু প্রতি বছর ৪-৫ লাখ বেকার যুক্ত হচ্ছে। সে অর্থে নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের এই নির্মম সত্যটি মেনে নিতে হবে, সবার জন্যে কর্মসংস্থান এখনই সৃষ্টি সম্ভব নয়, তবে সরকার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা জনসংখ্যার বোনাস যুগে প্রবেশ করেছি, এই পর্বে তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি এবং সমাজবিজ্ঞানীদের মতে এর স্থায়িত্ব ৩০-৪০ বছর হতে পারে। সুতরাং আমাদের কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষি হতে পারে বিরাট কর্মক্ষেত্র তৈরির প্লাটফর্ম। একজন শিক্ষিত তরুণ খুব সহজেই বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদের জ্ঞান লাভ করতে পারে। আগ্রহ, একাগ্রতা থাকলে অল্প পুঁজিতে প্রতি মাসে ৪০-৫০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। কৃষি বিভাগ সব সময় কৃষি উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি উপজেলায় রয়েছে কৃষি অফিস, যেখান থেকে সহজেই অঞ্চলভিত্তিক লাভজনক কৃষির ধারণা নিয়ে একজন তরুণ তার জীবনধারা পালটে ফেলতে পারে। কিছুদিন আগে কথা হলো কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যারা নিজ এলাকায় ক্যাপসিকাম চাষ করে বেশ আয় করেছে। এমন নতুন নতুন ফসল চাষের মাধ্যমে নিজেরা স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখা সম্ভব। কৃষির যে সব অনুবিভাগ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে সহায়ক হবে—
অনলাইন কৃষিবাজার :কৃষক ও ভোক্তার মাঝখানে একটা সরল লিংকেজ হতে পারে অনলাইন কৃষিবাজার। বিভিন্ন সময় পত্রিকার শিরোনামে দেখা যায় কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। স্থানীয় বাজারের নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় পাইকার কিংবা ফড়িয়াদের দখলে থাকে, ফলে কৃষক হয়ে পড়ে জিম্মি। এক্ষেত্রে অনলাইন কৃষিবাজার হতে পারে সহজ সমাধান। শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তারা চাইলে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করে শহুরে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারবে অথবা কৃষকদের স্বল্প প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এতে অনেকের কর্মসংস্থান হবে। এর মধ্যে বাংলাদেশে অনলাইন কৃষিবাজার চালু হয়েছে। এতে অনেক তরুণ কাজ করছে।
ছাদকৃষি: অনেক উদ্যোক্তা ছাদকৃষি প্রজেক্টের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছে। শহরে জায়গা স্বল্পতা, কৃষি এখন ভার্টিক্যালি সম্প্রসারিত হচ্ছে।
যান্ত্রিকীকরণ: ভর্তুকি মূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি সহজলভ্য হয়েছে। এইসব যন্ত্রের মাধ্যমে অনেকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হতে পারে।
চারা উত্পাদন: গুণসম্পন্ন চারার জার্মপ্লাজম সেন্টার তৈরি করে ভালো আয় করা সম্ভব। ভালো চারা পাওয়া আজকাল কঠিন। এক্ষেত্রে শিক্ষিত তরুণদের কাছে ভালো কিছু আশা করা যেতে পারে।
ফুড প্রসেসিং: আমাদের অনেক ফসল ক্ষতির সম্মুখীন হয় শুধুমাত্র প্রক্রিয়াজাতকরণশিল্পের অভাবে। আলুর দাম সব সময় একরকম থাকে না, অনেক সময় দেখা যায় কৃষক ন্যায্যমূল্যের অভাবে আলু রাস্তায় ফেলে প্রতিবাদ করছে। এমন দৃশ্য আমাদের দেখতে হবে না যদি আলু থেকে চিপস কিংবা অন্যান্য খাবারের প্রক্রিয়াজাতকরণশিল্প উপজেলা, জেলা পর্যায়ে গড়ে ওঠে। এতে করে পাইকার কিংবা ফড়িয়াদের কবল থেকে মুক্তি পাবে কৃষক।
ফিড প্রসেসিং :ফিডের চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। এখানেও কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে।
অর্নামেন্টাল ট্রি সাপ্লাই :অফিস, বাসাবাড়ি, শপিংমল কিংবা বড় বড় ইমারতের চারপাশে অর্নামেন্টাল ট্রি দিয়ে নান্দনিক সজ্জা করা হয়। এক্ষেত্রে অনেকেই চাহিদামাফিক ট্রি খুঁজে পায় না। সুতরাং এমন কর্মক্ষেত্র তৈরি করে স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব।
ইন্টেরিয়র ট্রি অরিয়েন্টেশন :অর্কিড, ক্যাকটাস শোভিত অফিস, বাসাবাড়ি অনেকের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ইতিমধ্যে অনেক উদ্যোক্তা ফার্ম হাউজ খুলে অফিস-বাসাবাড়ির ইন্টেরিয়র ডিজাইন শোভাবর্ধন গাছের সহায়তায় করে দিচ্ছে। এভাবে তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান।
কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, ময়মনসিংহ