মনে হয় জীবনের কোনো দাম নেই

আজ দুই কবির ভাবনা খুব বেশি মনে পড়ছে। একদিকে, ‘জন্মিলে মরিতে হবে অমর কে কোথা কবে’, অপরদিকে ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে’-মৃত্যু নিয়ে এই দুই কবির দুই চরণ কবিতা-ভাবনা হলেও পরিণত বয়সে মৃত্যু আর অপরিণত বয়সে হঠাত্ মৃত্যু আসমান জমিন ফারাক। অথচ আমরা কেউ জানি না সে দিন জীবনে কবে নেমে আসবে। নিঃশ্বাসে বিশ্বাস নেই। থিওরি মেনে নিয়েও খবরের কাগজে দৈনন্দিন মৃত্যু সংবাদ বিশেষ করে হত্যা, খুন ও দুর্ঘটনামূলক খবর পড়ে প্রতিদিনই হা-হুতাশ করি। কিন্তু সেটা আমার জীবনেও যেকোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে তা মেনে নিতে মন চায় না। তবে কঠিন রোগে মারা গেলেও কষ্টের মধ্যে একটু সান্ত্বনা থাকে। কিন্তু স্রেফ দুর্ঘটনা তা সড়ক দুর্ঘটনা হোক, ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে হোক, আগুন লেগে হোক কিংবা জলে ডুবে হোক—সেই দুর্ঘটনাজনিত অকালপ্রয়াণ মেনে নেওয়া বড়ই কষ্টকর। আরও বেশি কষ্টকর হঠাত্ কেউ খুন হয়ে মারা গেলে। মনে হয় জীবনের সত্যি কোনো দাম নেই। এই আছে এই নেই। এতদিন শুনেছি সবার উপরে মানুষ সত্য, আসলেই কী তা? আজ তো আমার মনে হয়, সবার উপরে মৃত্যু সত্য, শুধু সত্য না, চিরসত্য বলতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ট্রাফিক আইন আধুনিকীকরণ, ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে হবে। রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানো বন্ধ করতে হবে। ভুয়া লাইসেন্সধারী গাড়ি চালাতে পারবে না, আমাদের দেশের চলমান আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চালকরা অসতর্কতা ও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালায় যা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। কেউ যেন আইন অমান্য করে বেপরোয়াভাবে গাড়ি না চালায়, সেজন্য যেমন সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন তেমনই প্রয়োজন আইনের যথাযথ প্রয়োগ। আমাদের পুলিশ প্রশাসনকে সড়কপথে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। প্রয়োজনে আইন অমান্যকারীর শাস্তি বা জরিমানা করতে হবে দল-মত নির্বিশেষে। কেননা দুর্ঘটনা ঘটে সামান্য ভুলেই। অথচ সামান্য ভুলের মাশুল দিতে হচ্ছে জীবন দিয়ে। শেষ হয়ে যাচ্ছে একটি প্রাণ। খালি হচ্ছে মায়ের সন্তান স্নেহের কোল, স্ত্রী বা স্বামী হারাচ্ছেন জীবন সাথী। ভেসে যাচ্ছে পরিবার। কত মর্মন্তুদ ঘটনা তা ভুক্তভোগী ছাড়া কে আর বোঝে! একটি প্রাণ রক্ষায় মানুষের আন্তরিকতা কত গভীর, সেও আমরা দেখি মৃত্যুমুখী মানুষের জীবন বাঁচাতে যখন অসংখ্য মানুষ সাড়া দেয়। এগিয়ে আসেন অঙ্গদান, রক্তদান, অর্থদান এসমস্ত প্রাণদায়ী সংগঠন। তখন জীবন মনে হয় পূর্ণিমার জ্যোত্স্না। উল্টোদিকে অমাবস্যার আঁধার দেখি, যখন কারো ভুল বা দায়িত্বহীনতার জন্য অমূল্য প্রাণ ঝরে যায়। এই যে কদিন আগে এক সাংবাদিক মারা গেলেন, এক পথচারী বা বাসের রেষারেষিতে প্রায়ই মারা যাচ্ছেন নিরপরাধ মানুষ, সাঁতার না জেনে জলে নেমে মারা গেলেন দুই বন্ধু, ডাক্তারের ভুল চিকিত্সায় অকালে মারা যাচ্ছেন মানুষ হঠাত্ কেউ খুন হয়ে মারা যাচ্ছেন- এসব অসহনীয় মৃত্যু সহ্য করা যে কত বেদনাদায়ক, হূদয়বিদারক তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তখন ‘জন্মিলে মরিতে হবে’-কবির বাণী যেন ফিকে হয়ে যায় ক্রন্দনাশ্রুতে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, শিবগঞ্জ সরকারি এম এইচ কলেজ, শিবগঞ্জ, বগুড়া