চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের জন্য ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ধরা হয়েছে। যদিও এ খাতে অর্জিত প্রবৃদ্ধির চেয়ে ওই লক্ষ্যমাত্রা বেশি রাখা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি খাতের ঋণের লক্ষ্যমাত্রাও বাড়িয়ে ধরা হয়েছে। আর অন্যান্য বিষয়ে তেমন কোনো পরিবর্তন না এনে আগের ধারাবাহিকতা রাখা হয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় নির্বাচনের পরে অর্থাত্ জানুয়ারি-জুন সময়ে বিনিয়োগ ও উত্পাদন কর্মকাণ্ড আরো জোরাল হবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকে চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন গভর্নর ফজলে কবির। এ সময় ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামান, বাংলাদেশ ব্যাংকের চেইঞ্জ ম্যানেজমেন্ট অ্যাডভাইজার আল্লাহ মালিক কাজেমী, ব্যাংকিং রিফর্ম অ্যাডভাইজার এস কে সুর চৌধুরী, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মোহা. রাজি হাসান, নির্বাহী পরিচালক (গবেষণা) মো. আখতারুজ্জামানসহ অন্য নির্বাহী পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন।
মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হয়েছে। আর সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ ধরা হয়েছে। এর আগের মুদ্রানীতিতে বার্ষিক বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং সরকারি খাতে ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। গভর্নর অনুষ্ঠানে বলেন, চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি খাতের ঋণে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ করে। সে হিসাবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমছে না।
ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে যেয়ে গভর্নর বলেন, সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য অনিশ্চয়তার উত্কণ্ঠা এর একটি কারণ হয়ে থাকতে পারে। এছাড়া, আমানত ও ঋণ সুদহারের যোগান ও চাহিদাভিত্তিক ওঠানামায় সাম্প্রতিককালে সৃৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা বেসরকারি খাতে ঋণ যোগানের প্রবাহকে প্রভাবিত করছে কিনা সে বিষয়টিও অর্থবর্ষের দ্বিতীয়ার্ধে স্পষ্ট হবে।
গভর্নর বলেন, মুদ্রানীতির প্রথম মুখ্য উদ্দীষ্ট ভোক্তামূল্যষ্ফীতি পরিমিত রাখার লক্ষ্য অর্জনে প্রথমার্ধের সাফল্য বেশ সন্তোষজনক। তবে মূল্যস্ফীতির চাপ বিরাজমান থাকার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এজন্য মূল্যস্ফীতি পরিমিত রাখায় সতর্কতা শিথিল করার অবকাশ এখনো আসেনি। তিনি বলেন, মুদ্রানীতির দ্বিতীয় মুখ্য উদ্দীষ্ট জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে সমর্থন যোগানো। অর্থবছরের প্রথমার্ধে এ উদ্দীষ্ট অর্জন হয়েছে।
এদিকে কর্পোরেট খাতের অত্যধিক ব্যাংকনির্ভর মেয়াদী অর্থায়নকে কমাতে মূলধন বাজারে বন্ড ইস্যু করে অর্থায়নের দিকে মোড় ঘোরানোর প্রয়াস চলছে। একইসঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের মেয়াদী অর্থায়ন আহরণের সরলতর ক্রাউডফান্ডিং বিকল্পটির বিধিব্যবস্থা প্রণয়ন ও প্রবর্তন এখন সময়োচিত হবে। এসব বিষয়ে কাজ অনেকদূর এগিয়েছে বলেও বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে।
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বিষয়ে গভর্নর বলেন, সরকার গঠন হওয়ার পর নতুন অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন যে, খেলাপি ঋণ আর বাড়বে না। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থমন্ত্রণালয়ের দুটি কমিটি এজন্য কাজ করছে। খেলাপি ঋণ বিষয়ক নতুন নীতিমালা পাস হলে খেলাপি ঋণ কমে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। ডলারের দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ডলারের দাম বৃদ্ধিতে উদ্বেগের কিছু নেই। বরং অন্যান্য দেশের তুলনায় ডলারের বিপরীতে টাকা বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়ে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম খুব বেশি উঠানামা করছে না। এটা নিয়ে খুব বেশি উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। ব্যাংকিং খাতে সরকারের বিভিন্ন ছাড় দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমানত ও ব্যাংক ঋণ সুদের হার ৬ ও ৯ পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ার বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে।
ফজলে কবির বলেন, এডিআর (ঋণ-আমানত অনুপাত) সীমার অতিরিক্ত ঋণ বিতরণকারী ১১ ব্যাংককে আগামী মার্চ মাসের মধ্যেই তা সমন্বয় করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এই সময়সীমা আর বাড়াবে না। তিনি বলেন, আমাদের বাজারে এখন যথেষ্ট পরিমাণ উদ্বৃত্ত তারল্য (সারপ্লাস লিকুইডিটি) রয়েছে। সে কারণে এখন এডিআর বাস্তবায়নের সময়সীমা বৃদ্ধির বিষয়ে কিছু ভাবছি না।
তিনি বলেন, ২০১৮ এর নভেম্বরের হিসাব অনুযায়ী ৭৯ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে। বর্তমানে ব্যাংক খাতের গড় এডি রেশিও ৭৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ । ৫৯ টি ব্যাংকের মধ্যে শুধু ১১ টি ব্যাংকের এডি রেশিও কিছুটা বেশি রয়েছে। এছাড়া ৪৮ টি ব্যাংক এই সীমার মধ্যেই রয়েছে। কাজেই আমি মনে করি এখনও যথেষ্ট সময় আছে। আগামী মার্চ মাসের ৩১ তারিখের মধ্যে সবাই এই সীমার মধ্যে চলে আসতে পারবে বলে আশা ব্যক্ত করেন গভর্নর।