এম. এ. মাসুম
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা। এ খাতের একটি বড় সমস্যা হলো উচ্চ খেলাপি ঋণ। দেশের বহু সংখ্যক ব্যাংক ও নন ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণে জর্জরিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। বলা যায়, খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোর ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছে। খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকিং খাতে নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ঝুঁকি তৈরি করেছে। মাত্রাতিরিক্ত খেলাপির প্রভাব পড়ছে ঋণ ব্যবস্থাপনায়। ফলে এগোতে পারছে না ভালো উদ্যোক্তারা। পরিণামে বাড়ছে না বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। এ কারণে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বিগত সময়ে দেখা গেছে, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ঋণ পুনর্গঠন, ঋণ পুনঃতফসিল, ঋণ অবলোপন ইত্যাদির মাধ্যমে খেলাপির দায় থেকে মুক্ত থেকেছেন। বিদ্যমান আইনে খেলাপি ঋণ আদায়ের বিষয়ে দিকনির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু যে কোন প্রতিষ্ঠান উচ্চ আদালতে গিয়ে সহজেই আদায় প্রক্রিয়ার ওপর স্থগিতাদেশ নিয়ে আসতে পারছে। ফলে খেলাপি ঋণ সমস্যার কোন স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। সমাধানটি এমন হওয়া উচিত যাতে ঋণ খেলাপিরা যত বড় প্রভাবশালীই হোন, তাদের কাছ থেকে খেলাপি ঋণ আদায়ের বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে।
সম্প্রতি নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দায়িত্ব নেয়ার পর পরই খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, খেলাপি ঋণ আদায়ের সময় আত্মীয়স্বজন চেনা যাবে না। পাশাপাশি ভালো ঋণ গ্রহীতাদের প্রণোদনা দিতে হবে। আর্থিক খাতে সংকট নিরসনে স্থায়ী পদক্ষেপ হিসাবে এ খাতকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। ব্যাংকিং খাত সংস্কারে একটি কমিশন গঠনের দাবি দীর্ঘদিনের। খেলাপিরা যেন আদালতে গিয়ে ব্যাংকারদের সাথে সমঝোতার মাধ্যমে খেলাপি ঋণ পরিশোধ করেন এমন ব্যবস্থা রাখা হবে। ১৯৭২ সালে ব্যাংকিং খাত যে আইনের অধীনে পরিচালিত হয়েছে তাকে ভিত্তি ধরেই বিদ্যমান আইন সংশোধন করা হবে। তবে বিধি প্রণয়নের মাধ্যমে খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া গেলে সেটি সবার আগে করা হবে।
খেলাপি ঋণ হ্রাসে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক আয়োজিত অভ্যন্তরীণ ঋণ ঝুঁকি পরিমাপক পদ্ধতি বা ইন্টারনাল ক্রেডিট রিস্ক রেটিং সিস্টেম (আইসিআরআরএস) নীতিমালা উদ্বোধন করা হয়। নীতিমালায় বলা হয়েছে, মূল্যায়নের ভিত্তিতে গ্রাহককে চার শ্রেণিতে বিভাজন করবে ব্যাংকগুলো। কোন গ্রাহক ‘চমত্কার’ (এক্সিলেন্ট) বা ‘ভালো’ (গুড) রেটিং পেলে ব্যাংক তাকে অর্থায়ন করতে পারবে। ‘প্রান্তিক’ (মার্জিনাল) রেটিংধারী গ্রাহককে পুরনো ঋণ নবায়ন বা নতুন করে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। তবে ‘অগ্রহণযোগ্য’ রেটিংধারীকে কোন পরিস্থিতিতেই নতুন ঋণ দিতে পারবে না ব্যাংকগুলো, যদি না আগের ঋণ শতভাগ নগদ পরিশোধ হয় অথবা জামানত দিয়ে ঋণটি আচ্ছাদন করা হয়। ‘অগ্রহণযোগ্য’ রেটিংভুক্ত গ্রাহকের আগের ঋণ সর্বোচ্চ দুবার নবায়ন বা বর্ধিত করা যাবে।
নীতিমালা অনুযায়ী এখন থেকে নতুন ঋণ, ঋণ নবায়ন ও বিদ্যমান ঋণ বাড়ানোর প্রস্তাবের ক্ষেত্রে অবশ্যই এ রেটিং সম্পন্ন করতে হবে ব্যাংকগুলোকে। এ রেটিং পদ্ধতিটিকে ফলপ্রসূ করার জন্য কোন খাতের গ্রাহকের রেটিং করতে হবে, তার কিছু খাত-উপখাত নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শিল্পখাতের মধ্যে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, খাদ্যপণ্য, ঔষধ, রাসায়নিক, সার, সিমেন্ট, সিরামিক, জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙা, পাটকল, ইস্পাত প্রকৌশল, গ্যাস-বিদ্যুত্ ও অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে, কৃষিভিত্তিক ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সেবা খাতের আবাসন ও নির্মাণ, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, টেলিকমিউনিকেশন ও অন্যান্য সেবার প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে এ রেটিং পদ্ধতি অনুসরণ করে ঋণ দিতে হবে। নীতিমালায় ২০টি মডেল দেয়া আছে যা কার্যকরভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করা হলে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ঋণ প্রাপ্তির যোগ্যতা অনুযায়ী ঋণ সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে এবং খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে এ মডেল সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
খেলাপি ঋণ হ্রাসে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান একীভূতকরণের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। বিশ্বের অনেক দেশেই ব্যাংক একীভূতকরণের নিয়ম আছে। ২০০৯ সালে শিল্প ঋণ সংস্থা ও শিল্প ব্যাংক একীভূত করে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল) গঠিত হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নীতিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি ঋণ খেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায়ে দ্রুত ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করা প্রয়োজন। এ আইনের সব ধারা ও উপধারার দুর্বলতা শনাক্ত করে এতে সংশোধনী আনার মাধ্যমে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।