প্রতিবছর বাজেট পেশ হলে সাধারণ জনগণের বড় অংশের আগ্রহ থাকে পণ্যের দাম বাড়া-কমার ওপর। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ক্ষেত্রেও অনেকের মধ্যে একই প্রবণতা দেখা গেছে। বাজেটে অর্থনীতির বিভিন্ন দিকের বিস্তর আলোচনার চেয়ে তাদের চিন্তার কেন্দ্রে ছিল বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়া-কমার বিষয়টি।
বৃহস্পতিবার (৩ জুন) রাজধনীর বিভিন্ন স্থানে ইত্তেফাক অনলাইনের সঙ্গে আলাপকালে সাধারণ মানুষ তাদের বাজেট প্রতিক্রিয়া জানান।
অনেক কিছুর দাম বাড়তে পারে জেনে এতটা প্রতিক্রিয়া না দেখালেও সব ধরণের মাংসের মূল্য বাড়বে জেনে ক্ষুব্ধ হয়েছেন অনেকে। ফুটপাতে ফল বিক্রেতা হাফিজুর রহমান বলেন, এমনিতে করোনার জন্য ব্যবসাবাণিজ্য খারাপ। কোনরকম খেয়ে-পরে আছি। মাংসের দামই বাজারে এমনতি বাড়তি। এখন মাংস কিনে খাইতে পারি যদি বাড়ানো হয় তাহলে মাংস আর খাবো কি করে! আরেকজন রিকশা চালক আবুল কালাম বলেন, গ্রামে বউ-বাচ্চা রাইখা ঢাকায় রিকশা চালাই। এমনিতে অনেক দিন পর মাংস কপালে জুটে। এখন যদি নতুন করে মাংসের দাম বাড়ে আমরা মাংস না খেয়েই থাকতে হবে। বাজেট দিয়া কী করুম, দাম কম হইলেই হয়।
এদিকে সিগারেটের দাম বাড়বে শুনে অনেকে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানান। পাঠাও চালক রাকিবুল হাসান বলেন, আমরা যারা ধূমপান করি তাদের নির্দিষ্ট এ্যামাউন্ট প্রতিদিন সিগারেট পিছনে খরচ হয়। চেষ্টা করি কম খাওয়ার জন্য। পরিবার থেকে নিষেধ করে না খাওয়ার জন্য তবুও ফেরাতে পারি না। সিগারেটের মূল্য বাড়লে হয়তো কিছুটা কম খাবো। কমপক্ষে টাকার মায়ায় পড়ে ফেরানো যাবে এ অভ্যাস। আগে দিনে পাঁচ-ছয়টা খাইতাম, এখন নাহয় দুই-তিনটা খাব।
স্যানেটারি ন্যাপকিন দাম কমবে শুনে একজন বেসরকারি কর্মকর্তা ফাহিমা আক্তার সুমি জানান, এইটা নিশ্চয়ই একটা ভালো কাজ বলতে হবে। মূল্য কমলে এদিকে যেমন স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়বে একইভাবে ব্যবহারের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে। গ্রাম-গঞ্জে এখনো অনেকেই দাম বেশি বলে ব্যবহার করতে চাইলে পারে না। এখন দাম কমলে ব্যবহারে সহজে আগ্রহী হবে।
আরেকজন বেসরকারি চাকরিজীবী মেহেদী হাসান বলেন, জনগণবান্ধব বাজেট হওয়া উচিত। আমাদের সাধারণদের কথা চিন্তা করেই বাজেট পরিকল্পনা করা দরকার। করোনায় অনেকে কর্মহীন হয়ে পড়েছে। এছাড়া আমরা এখনো যারা কাজ করছি অনেকেরই বেতন-ভাতার ঠিক নেই। ফলে বাজেটে সব পণ্যদ্রব্য আমাদের সাধারণদের জন্য সহজলভ্য করা উচিত। যেন বউ বাচ্চা নিয়ে দুমুঠো খেয়ে বেঁচে থাকতে পারি।
প্রস্তাবিত বাজেটে কিছু পণ্যের ভ্যাট, আমদানি শুল্ক, আগাম কর, সম্পূরক শুল্কে ছাড় দেওয়া হয়েছে। ফলে এসব পণ্যের দাম কমতে পারে। এমনকি দাম কমবে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে কোভিড-১৯ টেস্ট কিট, পিপিই এবং ভ্যাকসিন উৎপাদনে আমদানি কাঁচামালও।
দাম কমবে দেশীয় ফ্রিজ, গাড়ির যন্ত্রাংশ। এছাড়া ব্লেন্ডার, জুসার, মিক্সার, গ্রাইন্ডার, ইলেক্ট্রিক কেটলি, রাইস কুকার, মাল্টি কুকার, প্রেসার কুকারের স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এতে এসব পণ্যের দাম কমতে পারে। ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন ও ইলেক্ট্রিক ওভেনের উৎপাদন পর্যায়ের ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ফলে এসব পণ্যের দামও কমতে পারে। এছাড়া রয়েছে কৃষি যন্ত্রপাতি, মাক্রোবাস, হাইব্রিড গাড়ি ও স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদিত স্যানিটারি ন্যাপকিন ইত্যাদি।
এই বাজেটে কিছু পণ্যে আয়কর, শুল্ক, ভ্যাট অথবা সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। এতে এসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে।
পণ্যগুলো হলো, গুড়ো দুধ, বাদাম, সব ধরণের মাংস, মাশরুম, খনিজ লবন, বিদেশি বিস্কুট, চুইংগাম,বিদেশী গাজর- টমটোসহ সব বিদেশী ফল। বিড়ি, সিগেরেট, জর্দা, তামাক, লুব্রিকেটিং ওয়েল, খনিজ তেল, গাড়ি, মোবাইল ফোন, বিমানের কাচ, লঞ্চের কেবিন ভাড়া, সাবান, থিম পার্কের রাইড, টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার ও বিদেশি রড ও সমজাতীয় পণ্য।
২০২১-২০২২ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা।
বৃহস্পতিবার (৩ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এটি অর্থমন্ত্রী হিসেবে মুস্তফা কামালের তৃতীয় বাজেট। আর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৩তম বাজেট।
ইত্তেফাক/এসজেড