শব্দদূষণ রোধে প্রযুক্তি

সাধারণভাবে আমরা যে শব্দ চাই না এবং যে শব্দ মানুষ ও প্রাণীর শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে, সেটিই শব্দদূষণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০ ডেসিবেল শব্দের মাত্রা হলে আমরা সেটি শুনতে পাই এবং এর কম মাত্রা হলে শুনতে পাই না। আমরা ২০ থেকে ২০ হাজার হার্জ পর্যন্ত শব্দ শুনতে সক্ষম। কিন্তু শব্দের মাত্রা এর চেয়ে বেশি হলে আমাদের শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর আইনের অধীনে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে বিধিমালায় বলা হয়েছে, আবাসিক এলাকায় রাত ৯টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত শব্দের মাত্রা ৪৫ ডেসিবেল এবং দিনের অন্য সময়ে ৫৫ ডেসিবেল অতিক্রম করতে পারবে না। বাণিজ্যিক এলাকার ক্ষেত্রে তা যথাক্রমে ৬০ ও ৭০ ডেসিবেল অতিক্রম করতে পারবে না। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতের আশপাশে ১০০ মিটার পর্যন্ত ‘নীরব এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে রাতে ৪০ ডেসিবেল এবং দিনে ৫০ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের কোথাও এ মাত্রা মেনে চলা হয় না। সব জায়গাতেই শব্দের মাত্রা নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি পাওয়া যায়। গাড়ির হর্ন, নির্মাণকাজ, মাইকের ব্যবহার, শিল্পকারখানা এবং পাইলিংয়ের কাজ, ইট ভাঙার যন্ত্র, সিমেন্ট মিক্সার যন্ত্র, ড্রিল মেশিন ইত্যাদির যথেচ্ছ ব্যবহার প্রতিনিয়ত শব্দদূষণের মাত্রাকে ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। অনেক পরিবেশবাদী বাংলাদেশের শব্দদূষণের বর্তমান পর্যায়কে ‘শব্দ-সন্ত্রাস’ নামে অভিহিত করেছেন।

তথ্যমতে, শব্দদূষণের কারণে দেশের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ শ্রবণশক্তির সমস্যায় ভুগছে। সেই সঙ্গে রয়েছে ঘুমের ব্যাঘাত, লেখাপড়ার সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, হূদেরাগসহ ফুসফুসজনিত জটিলতা, মস্তিষ্ক বিকৃতি, স্মরণশক্তি হ্রাস এবং মানসিক চাপসহ বিভিন্ন সমস্যা। এক্ষেত্রে শিশু ও প্রবীণরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের ৬১ শতাংশ মানুষ শব্দদূষণের ফলে হতাশা ও উদ্বেগের মতো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। নোবেলজয়ী চিকিত্সক রবার্ট কোচ (যিনি ১৯১০ সালে যক্ষ্মাবিষয়ক যুগান্তকারী অবদান রাখেন) বলেছেন, ‘মানুষকে একদিন কলেরা ও কীটপতঙ্গ ঠেকানোর মতো সমান গুরুত্বের সঙ্গে শব্দদূষণ মোকাবিলা করতে হবে।’

দিন দিন বেড়েই চলেছে শব্দদূষণ। তবে বিশ্বের প্রযুক্তিবিদরা বসে নেই। শব্দের বিরুদ্ধে লড়াই করার ব্যাপারে তারা বিভিন্ন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। ইংল্যান্ডের সলফোর্ড ইউনিভার্সিটির শব্দবিষয়ক প্রকৌশলী ট্রেভর কক্স এমন এক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন, যার মাধ্যমে তারা বর্তমান ভবনগুলোকে এমনভাবে বদলে দিতে পারবেন, যা বাইরের অবাঞ্ছিত শব্দগুলো ঠেকিয়ে রাখবে। সুনির্দিষ্ট শব্দতরঙ্গ আর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য তৈরি করে অবাঞ্ছিত শব্দকে ভবনের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হবে না। তাদের মতে, এই প্রযুক্তির কল্যাণে ভবিষ্যতে বিমানবন্দরের খুব কাছে বাস করাটাও হয়তো সম্ভব হবে। মি. ফাওলার জার্মানিতে টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব বার্লিনের অডিও কমিউনিকেশন গ্রুপের একজন সদস্য। ফাঁকা জায়গাকে শব্দ দিয়ে সুন্দর করে সাজানোর ব্যাপারে তিনি খুব আগ্রহী। সেখানে জাপানি ধাঁচে বাগান তৈরি করা—যেখানে থাকবে শুকনো পাথুরে ঝরনা, যা সত্যিকারের ঝরনার মতো প্রবাহিত হবে। তিনি বলেন, ‘স্থপতিরা ভবন নির্মাণের সময় বা জনসাধারণের ব্যবহারের জায়গায় এ ধরনের উদ্যোগ নিতে পারেন, যা সবার জন্য সহজেই একটা দূষণমুক্ত সুন্দর শব্দময় একটি পরিবেশ তৈরি করবে।’

রাস্তায় যানবাহনের শব্দকে সুরেলা ও দূষণমুক্ত করে তুলতে সক্ষম হয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের আরএমআইটি ইউনিভার্সিটির গবেষক জর্ডান ল্যাসি। তিনি ২০১৬ সালে শব্দ পরিবর্তনের এক অভিনব সরঞ্জাম তৈরি করেছেন। তিনি একটি পার্কের পাশের রাস্তার কোলাহল, যানবাহনের তীব্র আওয়াজ মাইক্রোফোনে রেকর্ড করে তার সঙ্গে মিশিয়েছেন সংগীতের মূর্ছনা। সেই সুরেলা শব্দ লাউড স্পিকারের মাধ্যমে পার্ক এলাকায় বাজছে। ফলে যেসব বাসিন্দা শব্দের অত্যাচারে ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখতেন এবং বারান্দায় বের হতেন না, তারা এখন নিশ্চিন্তে বারান্দায় বসতে পারছেন। ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার গবেষকরাও বিশেষ আকারের জানালা তৈরি করেছেন, যা চারপাশ থেকে আসা শব্দকে বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে ধরবে এবং বাড়ির মালিক তার ঘরের ভেতর পছন্দের সংগীত সেই শব্দের সঙ্গে মিশিয়ে একটা নতুন দূষণমুক্ত শব্দরাজ্য তৈরি করতে পারবেন।

বিশ্বব্যাপী মানুষ পরিবেশ দূষণ রোধে সোচ্চার। শব্দদূষণ রোধেও তারা এগিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রযুক্তির প্রয়োগ করছে এই শব্দদূষণের কবল থেকে রক্ষা পেতে। বিষয়টি নিয়ে আমাদেরও ভাববার সময় এসেছে। আমরা কি পারি না এমন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে, যা শব্দদূষণ রোধে সহজেই কাজ করবে?                

n লেখক : কবি ও কলাম লেখক

psaha09@yahoo.com