বায়ু দূষণের ভয়াবহতা এবং প্রতিকার

বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশের তালিকায় ভারত ও চীনের পরে বাংলাদেশের অবস্থান। অন্যদিকে বড় শহরগুলো মধ্যে দূষণের দিক দিয়ে বিশ্বে রাজধানী ঢাকার অবস্থান তৃতীয়। সম্প্রতি ঢাকার চেয়ে নারায়ণগঞ্জ ও রাজশাহীর অবস্থা আরও খারাপ। ইন্টারন্যাশনাল গ্লোবাল বার্ডেন ডিজিজ প্রজেক্টের প্রতিবেদনে বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর ক্ষেত্রে বায়ু দূষণকে চার নম্বরে  দেখানো হয়েছে। বিশ্বে প্রতিবছর ৫৫ লাখের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করে বায়ু দূষণের কারণে।  পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা  বলছেন, কার্যকরী ও জনসচেতনতা না বাড়ালে অদূর ভবিষ্যতে ভয়াবহ বায়ু দূষণে পড়বে বাংলাদেশ।

বাতাসে ভাসমান বস্তু কণার পরিমাপ করা হয় প্রতি ঘন মিটারে মাইক্রোগ্রাম হিসেবে। অতি সম্প্রতিকালে এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, ২.৫ মাইক্রোমিটার আকৃতির ভাসমান বস্তু কণা যথাক্রমে- ফার্মগেট, দারুস সালাম, সংসদ ভবন, নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী ও আগ্রাবাদে ৮৪.৫৩, ৮০.৪৪, ৬৩.৯০, ৯৪.০৫, ৬১.৬৭ ও ৭৮.৭৮। যার সহনীয় পরিমাণ হচ্ছে ৫০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনফুট।  উপরন্তু ঢাকার বাতাসে ক্যাডমিয়াম প্রায় ২০০ গুণ বেশি, নিকেল ও সিসার মাত্রা প্রায় দ্বিগুণ ও ক্রোমিয়াম প্রায় ৩ গুণের বেশি। পরিসংখ্যান হতে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে বাতাসে দূষণের পরিমাণ কত ভয়াবহ। পরিবেশ অধিদপ্তরের এক গবেষণা থেকে জানা যায় যে, ঢাকা শহরের বায়ু দূষণের জন্য ইটভাটা দায়ী ৫৮%, ডাস্ট ও সয়েল ডাস্ট ১৮%, যানবাহন ১০%, বায়োমাস পোড়ানো ৮% এবং অন্যান্য উত্স ৬% দায়ী। একজন সুস্থ স্বাভাবিক লোক গড়ে ২,০০,০০০ লিটার বায়ু শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করে থাকে। দূষিত বায়ুর কারণে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এ থেকে ক্যান্সার হতে পারে, যা মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। ইটভাটা থেকে নাইট্রোজেন, অক্সাইড ও সালফার-ডাই অক্সাইড অ্যাজমা, হাঁপানি, অ্যালার্জি সমস্যা, নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ বাড়িয়ে দেয়। বালুকণার মাধ্যমে ফুসফুসের স্লিকোসিস নামে রোগ সৃষ্টি হয়, যা ফুসফুসকে শক্ত করে দেয়। কার্বন-মনো-অক্সাইড রক্তের সঙ্গে মিশে অক্সিজেন পরিবহনের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। হূদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। সর্বোপরি বহু মানুষের অকাল মৃত্যুর কারণ হয়ে পড়ে এই বায়ু দূষণ।

সনাতন পদ্ধতির ইটভাটাগুলোকে জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব ইটভাটায় রূপান্তর করা গেলে ৭০-৮০% দূষণ কমানো সম্ভব। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন বন্ধকরণ, রাস্তা নিয়মিত পরিষ্কারকরণ, পানি ছিটানো, নির্মাণ কাজ চলাকালে পানি ছিটানো এবং নির্মাণ সামগ্রী আচ্ছাদন দ্বারা আবৃতকরণ, কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ।

অভ্যন্তরীর কক্ষের অর্থাত্ সাধারণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের বায়ু দূষণের পরিমাণ বহিরঙ্গের বায়ু দূষণের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০০ গুণ বেশি হয়ে থাকে।  একজন সুস্থ স্বাভাবিক লোক দৈনিক প্রায় ২,০০,০০০ লিটার শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে দূষিত বায়ু গ্রহণ করে থাকেন। যদিও সচেতন জনগণ খাবার পানির জন্য অর্থ ব্যয় করে থাকেন কিন্তু পরিশুদ্ধ বাতাসের জন্য কোনো অর্থ ব্যয় করে থাকেন না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অজ্ঞতার কারণে ঠান্ডা বাতাস পেয়ে থাকেন, কিন্তু পরিশুদ্ধ ঠান্ডা বাতাসের পরিবর্তে অধিকতর দূষিত ঠান্ডা বাতাস গ্রহণ করে থাকেন।  ফলশ্রুতিতে বায়ুবাহিত রোগ ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। প্রায়শই শোনা যায় অপারেশন সাকসেস কিন্তু ইনফেকশনের কারণে রোগী মারা গেছেন। হাসপাতালসমূহে ইনফেকশনের অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম কারণ হচ্ছে দূষিত/সংক্রমিত বায়ু। ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস. ধুলাবালি, পোলেন, প্যাথোজেন প্রভৃতি হাঁচি-কাশির মাধ্যমে রোগজীবাণু বাতাসে প্রায় ১৬০ ফুট পর্যন্ত প্রবাহিত হতে পারে।

দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশের শতকারা ৯০-৯৫ সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহের  রোগীদের বায়ু দূষণের মাধ্যমে সংক্রমিত না হওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। এমনকি অস্ত্রোপচার কক্ষ ও আইসোলেশন কক্ষসমূহের মত স্পর্শকাতর কক্ষসমূহের বায়ু দূষণমুক্ত করার কোনো ব্যবস্থা  নেই। সাধারণ মানের স্প্লিট টাইপ এয়ারকুলার স্থাপন করে কার্য পরিচালনা করা হচ্ছে। যাতে কোনো জীবাণু ধ্বংস করার কোনো ফিল্টারেশন, বাতাসের চাপ ও বেগ রক্ষাকরণ, ভেন্টিলেশন, বাতাস পরিবর্তন ও ফ্রেশ বাতাস আনয়নের কোনো ব্যবস্থা্  নেই। যার কারণে অভ্যন্তরীণ বায়ু দূষণ বহিরঙ্গের বায়ু দূষণের চেয়ে অধিকমাত্রায় বেশি। রোগীদের মাধ্যমে বাতাসে মিশে থাকে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস প্রভৃতি জীবাণু। যা একমাত্র হেল্থ কেয়ার এইচ.ভি.এসির পদ্ধতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা বহুলাংশে সম্ভব। পুরাতন বিদ্যমান হাসপাতালসমূহে হেল্থ কেয়ার এইচ.ভি.এসির পদ্ধতি স্থাপন করা সম্ভব নয় বিধায় প্রোটোবল এয়ার পিউরিফায়ার স্থাপনের মাধ্যমে বায়ু দূষণ বহুলাংশে হ্রাস করা যেতে পারে।

এপর্যায়ে বহিরঙ্গের বায়ু দূষণ প্রতিরোধের জন্য প্রচলিত আইনের প্রয়োগ জোরদার করা যেতে পারে । রোগমুক্ত হওয়ার স্থানসমূহে রোগী যাতে আরও রোগাক্রান্ত না হয় সেজন্য হাসপাতালসমূহে বায়ুবাহিত রোগ সংক্রমণের অন্যতম দূষিত বায়ু বন্ধের জন্য উন্নত বিশ্বের ন্যায় হেল্থ কেয়ার এইচ.ভি.এসির পদ্ধতি স্থাপন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। জনগণকে সম্পৃক্ত করে বায়ু দূষণের উত্সসমূহ নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। শুধু কুলিং এয়ার নয় “কোয়ালিটি এয়ার” চাহিদা হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।

n লেখক:তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, গণপূর্ত অধিদপ্তর, ঢাকা