প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি বিশ্বে মাথা উঁচু করে চলবে। দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে উন্নত, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ দেশ হবে বাংলাদেশ। সে লক্ষ্যেই কাজ করছি। গতকাল শুক্রবার বিকালে রাজধানীর বাংলা একাডেমিতে মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বইমেলা শুধু কেনাবেচা নয়, বইমেলা বাঙালির প্রাণের মেলা। এখানে লেখক-পাঠক-বইপ্রেমীদের মিলনমেলা ঘটে।
সরকার প্রধানের দায়িত্বে থেকে নিরাপত্তার বেড়াজালে নিয়মিত বইমেলায় আসতে না পারার কষ্টের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগে যখন ক্ষমতায় ছিলাম না, তখন এই মেলায় অনবরত ঘুরে বেড়াতাম। আর এখন অনেকটা বন্দি জীবন, এখন ইচ্ছা থাকলেও আসা যায় না। আর আসলেও অন্যের অসুবিধা হয়। তবে মনটা সবসময় বইমেলায় পড়ে থাকে।
বইয়ের চাহিদা কখনো শেষ হবে না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন সব ডিজিটাল হয়ে গেছে। মোবাইল বা অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসে বই পড়ে সবাই। কিন্তু যতই আমরা যান্ত্রিক হই না কেন, বইয়ের চাহিদা কখনো শেষ হবে না। নতুন বইয়ের মলাট, বই শেলফে সাজিয়ে রাখা, বইয়ের পাতা উল্টে পড়ার মধ্যে যে আনন্দ আছে, আমরা সবসময় তা পেতে চাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বছর ১৭ নভেম্বর একুশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিলাভের বিশ বছর পূর্তি হবে। ঊনসত্তরের উত্তাল গণঅভ্যুত্থান এবং বাংলার সংগ্রামী জনতার দ্বারা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে অভিষিক্ত করারও ৫০ বছর পূর্ণ হচ্ছে এ বছর। ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
শুধু মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নয়, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়েও অনেকে নানা বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন উল্লেখ করে জাতির পিতার কন্যা বলেন, বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং সস্প্রতি প্রকাশিত ‘সিক্রেট ডক্যুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দি নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ বই দুটিতে এসব বিভ্রান্তির অবসান হয়েছে বলে আমি মনে করি। মোট ১৪টি খণ্ডে প্রকাশিত হচ্ছে ‘সিক্রেট ডক্যুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দি নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে ‘সিক্রেট ডক্যুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দি নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ শীর্ষক বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশ করেন। যেখানে ১৯৫১ থেকে ‘৫২ ভাষা আন্দোলনকালীন বঙ্গবন্ধুর কারাজীবনের ওপর পাকিস্তানি গোয়েন্দা প্রতিবেদন লিপিবদ্ধ হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দুয়ার খুললো মাসব্যাপী একুশের বইমেলার। এবারের বইমেলায় অংশ নিয়েছে ৪৯৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। বইমেলার উদ্বোধন ঘোষণার আগে প্রধানমন্ত্রী এবারের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাওয়া চারজনের হাতে সম্মাননা তুলে দেন। কবিতায় কবি কাজী রোজী, কথাসাহিত্যে মনোরোগ চিকিত্সক মোহিত কামাল, প্রবন্ধ ও গবেষণায় বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যের জন্য গবেষক-কলামিস্ট আফসান চৌধুরী এবার এ পুরস্কার পেয়েছেন।
মিসরীয় সাংবাদিক-গবেষক মুহসেন আল আরিসি তার লেখা ‘হাসিনা হাকাইক আসাতি’ বইটির একটি কপি এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন। মুসলিম প্রধান একটি দেশে একজন নারী হয়ে নেতৃত্বে এসে শেখ হাসিনা কীভাবে মানুষের দিনবদলের রূপকার হয়ে উঠলেন, সেই বিবরণ এই বইয়ে তুলে ধরেছেন আরিসি। বইটির বাংলা তর্জমার শিরোমান ‘শেখ হাসিনা: যে রূপকথা শুধু রূপকথা নয়’। বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী বই মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন।
বাংলা একাডেমির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, ভারতের বিশিষ্ট বাঙালি কবি শঙ্খ ঘোষ, মিসরীয় বিশিষ্ট লেখক, সাহিত্যিক এবং ‘দি ইজিপসিয়ান গেজেট’ পত্রিকার সম্পাদক মহসিন আল আরিসি, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. আবু হেনা মোস্তফা কামাল, জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমেদ, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজী প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন রামেন্দু মজুমদার। মেলার প্রতিপাদ্য ‘বিজয়: ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ নবপর্যায়’।
এবারও মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে রয়েছে ‘শিশু চত্বর’। প্রতি শুক্র ও শনিবারে একটি সময়কে ঘোষণা করা হবে ‘শিশু প্রহর’ হিসেবে। খুদে লেখকদের জন্য এবার শিশু চত্বরে ‘তারুণ্যের বই’ নামে একটি নতুন আয়োজন থাকছে। ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা বইমেলা সবার জন্য খোলা। এছাড়া শুক্র ও শনিবার বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা এবং একুশে ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত মেলা চলবে।