শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনো দমিয়ে রাখতে পারেনা সুপ্ত প্রতিভা ও মেধার ক্রমবিকাশকে। প্রবল ইচ্ছাশক্তি দিয়ে নিজের প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে সাফল্যের পথে এগিয়ে যাওয়া কষ্টকর কিন্তু অসম্ভব নয়। তেমনি এক অদম্য কিশোরী মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার ধূলি গ্রামের মিতু রায় (১৩)।
স্বপ্নটাকে বাস্তবে রুপ দিতে হাতে তুলে নিয়েছে সুই, সূতা। পড়াশোনার পাশাপাশি হস্তশিল্পেও তার সুনিপুণ মেধা ও সুপ্ত প্রতিভার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। ঘিওর উপজেলার বালিয়াখোড়া ইউনিয়নের ধূলন্ডী গ্রামের অজিত রায়ের দুই মেয়ের মধ্যে ছোট মেয়ে মিতু রায়। মহাদেবপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী। বাড়ি থেকে স্কুল প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে। তার শারীরিক দিক বিবেচনা করে শিক্ষকরা তাকে সপ্তাহে দু একদিন স্কুলে যেতে বলেছেন।
নিজে কিছু একটা করবো এমন সিদ্ধান্ত থেকেই তার হাতে তুলে নেয় সুই, সুতা। তৈরি হয় মেট, নকশী কাঁথা, ব্যাগ, মেয়েদের সাইড ব্যাগ, পাপস ইত্যাদি। কম্পিউটার শেখার প্রতি অনেক আগ্রহ তার।
মিতু রায় বলেন, আমার ইচ্ছে ছিল আমার জীবনে এমন কিছু একটা করবো, যেখানে আমার কারও কাছে কাজের জন্য যাওয়া লাগবে না বরং আমি আমার প্রতিষ্ঠানে কিছু প্রতিবন্ধিদের চাকরি দিবো। আমি কখনো নিজেকে দুর্বল ভাবি না, অন্য মানুষের মতোই নিজেকে মনে করি। আর কাজ করে যাই নিজের স্বপ্নপূরণে। সরকারি কোনো অর্থ নৈতিক সহযোগীতা পেলে হস্তশিল্পের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে পারতাম।
মিতুর মা যমুনা রায় জানান, জন্মগতভাবেই মিতুর দুই হাত, পা অস্বাভাবিক। ডাক্তারী ভাষায় বলে মুগড় হাত, পা। দুই হাটুতে কোনো প্লেট নেই। হামাগুড়ি দিয়ে চলাচল, অথচ মুখে এক অনাবিল প্রস্ফুটিত হাসিতে মায়া জড়ানো। হুইল চেয়ারেই তার বেড়ে ওঠা। তবে এই হুইল চেয়ার আর বিছানায় বসেই প্রতিবন্ধিতা জয় করে ইতিমধ্যেই নিজেকে স্বাবলম্বী করে তুলেছেন। হস্ত শিল্পের সুনিপূণ কারুকাজে এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে আলোড়ন। অর্থের জোগান পেলে হস্ত শিল্পে তার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
মিতুর বাবা কাঁঠ মিস্ত্রি অজিত রায় বলেন, আমার দুই মেয়ের মধ্যে এই ছোট মেয়েকে নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু এখন আমি আমার এই প্রতিবন্ধী মেয়ের জন্য গর্ব করি। মিতু কুটির শিল্পের কাজ শেখার পর নিজেই ঘরে বসে তৈরি করে তা বিক্রি করে সংসারের স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছেন।
এ ব্যাপারে বালিয়াখোড়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. আওয়াল খান বলেন, সমাজে প্রতিবন্ধীরা যে বোঝা নয়, মিতু রায় তার জ্বলন্ত উদাহরণ। মিতু রায় পরিশ্রম করে সংসারের দুঃখ-কষ্ট দূর করতে চেষ্টা করছে। পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন। আমরা তাকে প্রতিবন্ধী ভাতা দিয়ে আসছি। তবে তার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় আরও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করব।
ইত্তেফাক/এনএ