টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) ১৭টি লক্ষ্য অর্জনে মোট ৩৩টি নির্দেশকে সঠিক পথে রয়েছে বাংলাদেশ। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এসব ইন্ডিকেটর বা নির্দেশকের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে। কিন্তু বাকিগুলোর অর্জনে আরো জোর দিতে হবে বলে এর অগ্রগতির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সহশ্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) অর্জনে অনেক সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নির্মূলসহ স্বাস্থ্য, শিক্ষা খাতে প্রশংসনীয় অর্জন করেছে। শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমানো, স্বাক্ষরতার হার বৃদ্ধিতে প্রতিবেশী দেশগুলো হতেও ভালো অর্জন করেছে বাংলাদেশ। ২০১৫ সালের এমডিজি শেষ হবার পর ২০১৬ থেকে শুরু হয়েছে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বা এসডিজি। এর মূল লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে এমডিজির লক্ষ্যগুলোকে টেকসই করা। এর পাশাপাশি মানুষের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন।
এসডিজির ১৭টি উন্নয়ন অভীষ্টের জন্য ১৬৯টি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে সর্বমোট ২৪১টি নির্দেশক বা ইন্ডিকেটর রয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ২৪১টি নির্দেশকের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তথ্য রয়েছে মাত্র ৭০টিতে। তাই এসডিজি বাস্তবায়নের শুরুতেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা। সম্প্রতি এসডিজির দুই বছরের অর্জনের প্রতিবেদন তৈরি করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। প্রতিবেদেন মোট ৬৩টি নির্দেশকের তথ্য সন্নিবেশন করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ৩৩টি নির্দেশকে বাংলাদেশ লক্ষ্য অর্জনের সঠিক পথেই রয়েছে। কিন্তু বাকী নির্দেশকগুলোতে আরো গুরুত্ব দিতে হবে। এমডিজিতে শুধু দারিদ্র্য কমিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল কিন্তু এসডিজিতে সকল প্রকার দারিদ্র্য কমিয়ে আনতে হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে চরম দারিদ্র্য হার লক্ষ্য অনুযায়ী কমে আসলেও শহর-গ্রামে দারিদ্র্য ব্যবধান এসডিজির লক্ষ্য অনুযায়ী কমে আসেনি। ২০১৭ সালের হিসাবে হত দরিদ্রের হার ১২ দশমিক ১ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০১০ থেকে ২০১৬ এই সময়ের মধ্যে গ্রামীণ হতদরিদ্রের হার ২১ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ১৪ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসে। এসময়ে শহুরে দারিদ্র্য ৭ দশমিক ৭ থেকে ৭ দশমিক ৬ ভাগে নেমেছে। অর্থাত্ শহুরে দারিদ্র্য হার একই রয়ে গেছে।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, হত দরিদ্র হার কমাতে বাংলাদেশ সঠিক পথে এগুলেও জাতীয় দারিদ্র্য রেখার নিচে বসবাসকারীদের সংখ্যা কমছে ধীরে। মাতৃমৃত্যুর হার কমে আসলেও এসডিজির লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। দেশে প্রতি লাখে মাতৃমৃত্যুর হার ১৭২ যা ২০২০ সালের মধ্যে ১০৫ এ নামিয়ে আনতে হবে। তবে নবজাতক ও পাঁচবছরের কম বসয়ীদের মৃত্যু হার কমিয়ে আনতে সঠিক পথেই রয়েছে বাংলাদেশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, খর্বাকায় ও স্থূল শিশুদের হার কমে আসলেও অপুষ্টির সঠিক তথ্য নেই। শিক্ষাখাতে স্কুল পর্যায়ে ছেলে-মেয়েদের ভর্তির হার সন্তোষজনক হলেও উচ্চ শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষায় মেয়েদের হার এসডিজির লক্ষ্য অর্জনে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।
উল্লেখ্য, এমডিজির তুলনায় এসডিজির ক্ষেত্রে কিছু ভিন্ন নির্দেশক যুক্ত করা হয়েছে। যেমন, দেশে বায়ু দূষণ কত মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে, কিম্বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করার ফলে অথবা অনিরাপদ পানি, স্যানিটেশনের ফলে মৃত্যুর হার কী, সে ধরনের তথ্য সন্নিবেশিত করতে হবে। শুধু দারিদ্র্য হার কমানো নয়, দারিদ্র্র্যের বহুমাত্রিকতা কমিয়ে আনতে হবে। সাধারণ মানুষের অন্তর্ভুক্তি কতটা হলো সেই তথ্য উঠে আসতে হবে। অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক সম্পর্ক উন্নয়ন, পরিবেশ উন্নয়নের বিষয়গুলোও রয়েছে।
অগ্রগতি প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম ইত্তেফাককে বলেন, এসডিজিতে মোট ২৪১টি ইন্ডিকেটর দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক ক্ষেত্রেই পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। তবে পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এ বিষয়ে কাজ করছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রথম এসডিজির অগ্রগতির প্রতিবেদন তৈরি করা হলো, যা আজ রবিবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে। পরবর্তীতে আরো নতুন তথ্য সন্নিবেশন করা হবে বলে তিনি জানান।
জিইডির দুই বছরের অগ্রগতি প্রতিবেদনে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে মোট ৬৩টি নির্দেশকের তথ্য রয়েছে। যারমধ্যে বেশকিছুর হালনাগাদ তথ্য নেই। ‘নিড এটেনশন’ বা আরো গুরুত্ব দিতে হবে এমন নির্দেশক রয়েছে ২০টি।
ড. শামসুল আলম বলেন, এসডিজি বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর অর্থায়ন। কারণ ২০৩০ সাল নাগাদ এসডিজির লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশে বাড়তি ৯২৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে। অর্থাত্ প্রতিবছর গড়ে বাড়তি বিনিয়োগ করতে হবে ৬৬ বিলিয়ন ডলার। মূলত নিজস্ব অর্থায়নের মাধ্যমেই এই বিশাল অর্থের যোগান দিতে হবে।