আমাদেরও উদ্বেগমুক্ত থাকিবার অবকাশ নাই

পরিবেশের অন্যতম ও প্রধান উপাদান হইল বায়ু বা বাতাস। এই বাতাস যদি দূষিত হয়, তাহা হইলে যেকোনো প্রাণীর বাঁচিয়া থাকাই কঠিন হইয়া পড়ে। এই পরিপ্রেক্ষিতে সমপ্রতি হাইকোর্ট রাজধানীর সড়কগুলিতে দুই বেলা পানি ছিটাইবার নির্দেশ দিয়াছেন। এই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা উচিত। কয়েক বত্সর আগে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একটি প্রকল্পের আওতায় ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় ঢাকার বাতাসে দূষণ ও বিপদের মাত্রা নির্ণয়ের উদ্যোগ নেয়। যে পদ্ধতিতে ইহা নির্ণয় করা হয়, তাহার নাম রিয়াল টাইম এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বা একিউআই। ইহা বিশ্বের সবচাইতে বেশি ব্যবহূত ও নির্ভরযোগ্য বায়ুমান সূচক। তাহাতে দেখা যায়, পৌনে দুই কোটি মানুষের আবাসস্থল রাজধানী ঢাকার বাতাস অতিমাত্রায় অস্বাস্থ্যকর ও বিপজ্জনক। বায়ুমান ভালো হইলে সবুজ, মোটামুটি ভাল হইলে হলুদ, কাহারো কাহারো জন্য অস্বাস্থ্যকর হইলে কমলা, সবার জন্য অস্বাস্থ্যকর হইলে লাল, অতি অস্বাস্থ্যকর হইলে, বেগুনি আর বিপজ্জনক হইলে খয়েরি রং দিয়া সূচক চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু ১৫ দিন ধরিয়া চলা গবেষণায় একটি মূহূর্তও ঢাকার রং সবুজ তো দূরের কথা, হলুদ এমনকি কমলাও দেখা যায় নাই।  বেশিরভাগ সময়ে দেখা গিয়াছে, বেগুনি, লাল ও খয়েরি। বিশেষ করিয়া দুপুর দুইটার পর হইতে ক্রমাগতভাবে ঢাকার বাতাসের মানের অবনতি হইতে থাকে। বিষয়টি উদ্বেগজনক নিঃসন্দেহে।

বায়ুদূষণের বড় কারণ হইল অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়ন। বাংলাদেশে এক পরিবেশ সমীক্ষায় দেখা যায়, ঢাকার চারিপাশে প্রায় হাজারখানেক ইটভাটা প্রতিবত্সরের নভেম্বর হইতে চালু হয়। সেইগুলি বায়ুদূষণের জন্য ৫৮ ভাগ দায়ী। ইহার বাহিরে রোড ও সয়েল ডাস্ট ১৮, যানবাহনের ধোঁয়া ১০, পোড়ানো জৈববস্তু ৮ ও অন্যান্য কারণ ৬ শতাংশ দায়ী। ঢাকা শহরে শুধু গাড়ির ধোঁয়া হইতে বত্সরে প্রায় তিন হাজার ৭০০ টন সূক্ষ্ম বস্তুকণা প্রতিনিয়ত বাতাসে ছড়াইতেছে। চিকিত্সকরা বলিতেছেন, এই সূক্ষ্মকণার মাত্রা ২.৫ হইলে তাহা ফুসফুস পর্যন্ত প্রবেশ করে। আর মাত্রা ১০ হইলে তাহা শ্বাসনালিতে আক্রমণ করে। ইহাতে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের সর্দি, কাশি, হাঁপানি, এলার্জি, অ্যাজমা ও শ্বাসকষ্ট বাড়িয়া যায়। বিভিন্ন জটিল ক্রনিক রোগে আক্রান্ত হয় মানুষ। কার্বন ডাইঅক্সাইড ও কার্বন মনোঅক্সাইড বাড়িয়া গেলে ফুসফুসে ক্যান্সারও হইতে পারে। বাতাসে ভাসিয়া থাকা সীসা শিশুদের বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধিতে বাধা দেয়। কালো ধোঁয়ায় থাকা বস্তুকণা ও সালফার ডাইঅক্সাইডের প্রভাবে ফুসফুস তো বটে, কিডনির জটিলতা এমনকি হূদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড ও সীসার কারণে শ্বাসযন্ত্রের প্রদাহ, নিউমোনিয়া ও ব্রংকাইটিস পর্যন্ত হইতে পারে। আবার ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির স্কুল অব মেডিসিনের বিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, ডায়াবেটিসের সঙ্গে বায়ুদূষণের খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান।

চীন ও ভারতের রাজধানীতে মাঝেমধ্যে বায়ুদূষণের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত বন্ধ রাখিতে হয়। তবে আমাদেরও উদ্বেগমুক্ত থাকিবার অবকাশ নাই। ইদানীং রাজধানীর সড়কে পানি ছিটাইবার হার বাড়িয়াছে যাহা আশাব্যঞ্জক। তবে পরিবেশবান্ধব ইটভাটা নির্মাণ, পরিকল্পিতভাবে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বায়ুদূষণকারী সামগ্রী পরিবহনের সময় তাহা ঢাকিয়া স্থানান্তর করাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে জরুরি ভিত্তিতে। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় এই ব্যাপারে বাংলাদেশ আবহাওয়া বা পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মিত সতর্কবার্তা প্রদান করা বাঞ্ছনীয়।