সারতাজ আলীম

মুক্তিযুদ্ধের গল্পের খোঁজে

শুরুটা ৪ বছর আগে। হলিউডের ধুন্ধুমার যুদ্ধের সিনেমা দেখে বাকি দশজনের মতোই সারতাজের মনে প্রশ্ন জেগেছিলো আমাদের দেশের বুকেও তো এক যুদ্ধ হয়েছিল। সে গল্পটাও তো হলিউডকে হার মানিয়েছিলো—অথচ  সেই  যুদ্ধের রোমাঞ্চ বা অ্যাকশন নিয়ে সিনেমা, বই বা গল্পের এত অভাব কেন? তরুণ প্রজন্ম সত্য ঘটনার নির্মিত হলিউডের কোন যুদ্ধের সিনেমা দেখে যে রোমাঞ্চ নিচ্ছে তার থেকে বড় রোমাঞ্চকর ঘটনাও ঘটেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে। বিষয়টি সারতাজকে ভাবায়। অবশেষে নিজেই শুরু করেন লেখালেখি। মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনাপ্রবাহকে থ্রিলারের আকারে তুলে আনা, পাশাপাশি ভবিষ্যতে ডকুফিল্ম তৈরিরও স্বপ্ন দেখছেন এই তরুণ।

সারতাজের পুরো নাম সারতাজ আলীম। পড়াশোনা করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে। পড়াশোনার চারদেয়ালের বাইরে যুক্ত আছেন খণ্ডকালীন সাংবাদিকতায়,  পুরোদমে চালিয়ে যাচ্ছেন লেখালেখিও। যুদ্ধের রোমাঞ্চকর গল্পগুলো বেশ প্রিয়, তাইতো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ফ্রন্টলাইনের রোমাঞ্চ, অ্যাকশন, থ্রিলের বিষয়গুলো প্রাধান্য পাচ্ছে সারতাজের লেখায়।

আদিম যুগের বেসামরিক বিমান নিয়ে বাংলাদেশের পাইলটদের দুর্ধর্ষ ‘এয়ার-অপারেশন’এর গল্প, ‘কিলো ফ্লাইট’ কোড নামের মিশনের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল যেকোন কল্পকাহিনীর চেয়েও রোমাঞ্চকর। এই ঘটনার উপর ভিত্তি করে লিখেন প্রথম গল্পটি। মুক্তিযুদ্ধের দুঃসাহসিক গল্পগুলো প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দেওয়ার ভাবনার কীভাবে এলো, জানতে চাইলে সারতাজ বলেন, হলিউডের গল্প থেকেও আমাদের গল্পগুলো রোমাঞ্চকর হলেও সেগুলো যেন অবহেলায় পড়ে আছে। শৈশবে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত তথ্যের অনেক ঘাটতি দেখেছি। সে ভাবনা থেকেই বছর চারেক আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় কিছু ব্লগ পোস্টে নিজ জায়গা থেকে মুক্তিযুদ্ধকে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা থেকেই গল্পের শুরু—বললেন এই তরুণ। "কিলো ফ্লাইট: দ্যা ফার্স্ট স্ট্রাইক" শিরোনামের প্রথম লেখা দেখেই মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে পাওয়া শুভকামনা' ও পাঠকদের ইতিবাচক সাড়াই তাকে বাড়তি প্রেরণা দেয়। এভাবেই লেখালেখি চালিয়ে যেতে থাকেন।

সম্মুখযুদ্ধ নিয়ে লেখা সামরিক বাহিনীর তথ্য বিবরণী, সামরিক-বেসামরিকদের লেখা বই, পত্রিকার কাটিং পড়ার পাশাপাশি খুঁজে বের করতে শুরু করেন সংশ্লিষ্ট যুদ্ধে অংশ নেয়া যোদ্ধা বা যুদ্ধক্ষেত্রের কোন প্রত্যক্ষদর্শীকে। অসংখ্য সূত্র ব্যবহার করে লেখা শব্দগুলো নিয়ে ৭১ এর ফ্রন্টলাইনের দুর্ধর্ষ অপারেশনগুলো থ্রিলারের আঁচ দিয়ে লেখা নিয়ে চলতি বছরের বইমেলায় প্রকাশ করেন  ‘১৯৭১:  ফ্রন্টলাইনের সেরা অপারেশন’। সারতাজের প্রকাশিত প্রথম এই বইয়ে আছে খুলনার 'ট্যাংক ব্যাটল অব শিরোমণি'র গল্প, যে যুদ্ধের যুদ্ধকৌশল বহু দেশের সামরিক একাডেমীতে পাঠ্য। উল্লেখ করা যায় কুড়িগ্রামের ‘চিলমারী রেইড’ এর কথা, যাকে নরম্যান্ডি ল্যান্ডিংয়ের সাথে তুলনা করা হয়, কাঠের ইঞ্জিনবিহীন নৌকাতে ৩ মাইল চওড়া ব্রহ্মপুত্র পাড়ি দিয়ে উচভর অভিযান চালিয়েছিল কর্ণেল তাহেরের বাহিনী। আরও আছে চট্টগ্রামের কুমিরায় ২৬শে মার্চের যুদ্ধ—যেখানে ১৫২ জন শত্রু খতম হয়। এরকম কিছু ইতিহাসের খোঁজ পাওয়া যাবে এই বইয়ে, জানান সারতাজ।

আগামীর গল্পটা কীভাবে সাজাতে চান, জানতে চাইলে সাতপাঁচ না ভেবেই সারতাজ বললেন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিশ্বমানের ডকুফিল্ম তৈরির ভাবনা রয়েছে তার, যা থেকে প্রজন্ম জানতে পারবে বাংলাদেশ তৈরির পেছনের গল্প।

 

ইত্তেফাক/এসটিএম