তদারকির অভাবেই ঘটছে ভয়াবহ দুর্ঘটনা

সঠিক নজরদারি ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে মগবাজারে সংঘটিত বিস্ফোরণের মতো আরও অনেক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। নগরবাসীর জন্য সেবামূলক ব্যবস্থাগুলো অপরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তিতাস গ্যাস তাদের ইচ্ছামত পরিকল্পনা নিয়ে গ্যাস সংযোগ দিচ্ছে। বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হচ্ছে একইভাবে নিজ বিভাগের তত্ত্বাবধানে। ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন কিম্বা ফায়ার সার্ভিসও নিজ নিজ পরিকল্পনায় কাগজে কলমে সেবা দিচ্ছে নগরবাসীকে।

এসব সেবা দিতে গিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে ঘটছে সমন্বয়হীনতা। আর এই সমন্বয়হীনতার কারণেই ঘটে যাচ্ছে একেকটি বড় ধরনের দুর্ঘটনা। যেখানে প্রাণহানি ঘটছে সাধারণ ও নিরপরাধ মানুষের। ঘটনার পর প্রতিটি সেবামূলক সংস্থা একেক জনের দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে পাড় পাওয়ার চেষ্টা করে। রবিবার (২৭ জুন) রাতে মগবাজারে একটি ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণে পর এর মূল কারণ সম্পর্কে কোনো পরিসেবামূলক প্রতিষ্ঠান দায় নিচ্ছে না।                          

                                   

নারায়ণগঞ্জে মসজিদে এসি বিস্ফোরণ

এ ব্যাপারে সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের প্রফেসর ড. আবুল হাসনাত বলেন, মগবাজারে বিস্ফোরণ ঘটেছে মূলত জমে থাকা গ্যাস থেকে। ভবনের নিচতলায় রেস্টুরেন্টে রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজি সিলিন্ডারের রিফিলের লিকেজ থেকে গ্যাস জমে যায়। রুমের ফলস সিলিংয়ে গ্যাস জমে থাকে। কাঁচ দিয়ে ঘেরা রান্নাঘর হওয়ায় জমে থাকা গ্যাস বাইরে বের হতে পারেনি। ধীরে ধীরে ফলস সিলিংয়ে জমে থাকা গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যায়। পরবর্তীতে জমে থাকা গ্যাসে কোনোভাবে বিদ্যুতের সংস্পর্শ বা আগুনের স্পর্শ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা প্রচন্ডভাবে বিস্ফোরিত হয়।

২০১৯ সালে দেশে প্রায় ৮০টি এলপিজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণ-দুর্ঘটনায় অন্তত ১০০ জন নিহত হন। এর বাইরে অনেকে গুরুতর আহতও হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পশ্চিম মাসদাইরে গত ৮ মার্চ এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারে বিস্ফোরণে মারা গেছেন চার জন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় আছেন আরো দুইজন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কুমিল্লার গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ডে গত ১১ মার্চ একটি বাসের সিএনজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আগুনে পুড়ে মারা যান দুই জন। আহত হন ১১ জন। এর আগে ২২ জানুয়ারি কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে বেলুনের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে নিহত হন অন্তত তিন জন। ১১ জানুয়ারিতে বরগুনার পাথরঘাটায় একটি বরফকলে অ্যামোনিয়া গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে একজন নিহত হন। আহত হন শতাধিক মানুষ।

                              

এ প্রসঙ্গে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ বলেন, দোকানে দোকানে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রি বড় সমস্যা তৈরি করছে। এই খুচরা বিক্রেতাদের অধিকাংশই সঠিকভাবে সিলিন্ডার সংরক্ষণ করেন না। এটি বন্ধ করা জরুরি। কেননা খুচরা মুদি দোকানদারদের কাছে থাকা সিলিন্ডারগুলো মৃদু ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা তারা বুঝতে পারেন না। পরে ওই ক্ষুদ্র লিকেজ-ত্রুটি গ্রাহক পর্যায়ে বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তিনি বলেন, খুচরা বিক্রি বা গ্রাহক পর্যায়ে এগুলো দেখভালের দায়িত্ব আমাদের কর্মপরিধিতে নেই। সে জনশক্তিও আমাদের নেই। আমরা মজুতদারদের লাইসেন্স প্রদান করি। খুচরা পর্যায়ে নয়। এলপিসহ সিলিন্ডার যারা বিক্রি করছেন সে কোম্পানিগুলোর উচিত- এ তদারকি, সচেতনতা এবং বিক্রয় পরবর্তী সেবা প্রদান করা। 

বিস্ফোরক অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, গত এক বছরে প্রায় ২শ’ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে প্রায় দেড়শ’ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের তল্লায় একটি মসজিদে নামাজ পড়ার সময় বিস্ফোরিত হলে ৩৬ জন মুসল্লী নিহত হন। মসজিদের পাশ দিয়ে তিতাস গ্যাসের লাইন লিকেজ হয়ে মসজিদের ভিতরে গ্যাস জমে যায়। সেটা থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। যদিও তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে তাদের দায় অস্বীকার করেছে। 

                                    

অন্যদিকে, ২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীতে কেমিকেল গোডাউনে বিস্ফোরণে ১২৪ জনের প্রাণহানি ঘটে। ওই ঘটনার পর পুরাণ ঢাকার আবাসিক এলাকা থেকে কেমিকেল গোডাউনগুলো সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিলেও সেটি বাস্তবায়ন করতে পারেনি সিটি কর্পোরেশন। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পুরাণ ঢাকার চুড়িহাট্টায় আবারো কেমিকেল গোডাউনে বিস্ফোরণে ৭৩ জনের প্রাণহানি ঘটে। সর্বশেষ গত ২৩ এপ্রিল আরমানিটোলায় একটি ছয়তলা ভবনের নিচতলায় কেমিকেল গোডাউনে বিস্ফোরণে ইডেন কলেজের একজন শিক্ষার্থীসহ ৪ জন নিহত হন। একেকটি ঘটনার পরপর কেমিকেল গোডাউনগুলো সরিয়ে নেওয়ার দাবি উঠলেও ২/১ দিন পর তা থেমে যায়। 

রাজধানীতে প্রায়ই ঘটছে গ্যাস লাইনের সংযোগ থেকে বিস্ফোরণ। কখনও রাস্তায় সঞ্চালন লাইন থেকে বিস্ফোরণ হচ্ছে, আবার কখনও বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগের লিকেজ থেকে গ্যাস জমে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটছে। গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর আসাদ গেটের আড়ং মোড়ে গ্যাস লাইন বিস্ফোরণে দু’টি গাড়িতে আগুন লাগে। গত বছরের ২৩ জুলাই রাজধানীর বংশাল কসাইটুলির একটি দোতলা বাড়ির নিচতলায় গ্যাস লাইন বিস্ফোরণে দেয়াল ধসে এক শিশুর মৃত্যু হয়। একইভাবে উত্তরখানের ব্যাপারীপাড়ায় একটি বাসায় গ্যাসলাইনের লিকেজে আগুন  লেগে একই পরিবারের ৩ জনের মৃত্যু হয়। 

এসব দুর্ঘটনা কেন ঘটেছিল, কারা দায়ী, কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা জানাতে পারেনি কোন মহলই। আর তিতাস গ্যাস এসব ঘটনাকে শুধু দুর্ঘটনা বলেই চালিয়ে দিয়েছে। একটি ঘটনাতেও তিতাসের কোনো গাফিলতি ধরা পড়েনি। গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনা এতই আকস্মিকভাবে ঘটে যে, তা থেকে সাধারণত পরিত্রাণ মেলে না। আর অগ্নিদগ্ধে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। গ্যাস বিতরণ সংস্থাগুলোর অপেশাদার মনোভাব আর গাফিলতিতেই বারবার দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছে। যদিও তিতাস বার বার বলছে, পুরনো পাইপলাইন পরিবর্তনের কাজ চলছে।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী ইকবাল মো. নূরুল্লাহ বলেন,তিতাসের পুরনো কিছু লাইন রয়েছে এবং তা পুন:স্থাপিত হচ্ছে। কিন্তু এই দুর্ঘটনায় সে ধরণের কোনো সংশ্লিষ্টতাই নেই। তিনি জানান, তিতাসের সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। গ্রাহক অভিযোগ জানালে বাসার ভেতরে গিয়েও সংযোগ পরীক্ষা করা হয়। 

তিতাস গ্যাসের পাশাপাশি রাজধানীতে রাস্তায় খোঁড়াখুড়ির কাজ করে ওয়াসা। বছর ধরেই চলে ওয়াসার পুরাতন ড্রেনের সংস্কার কাজ। ছোট ড্রেন বাতিল করে দিয়ে সেখানে বড় ড্রেন স্থাপন করার সময় প্রায় গ্যাস লাইন বা বিদ্যুৎ লাইন বা টেলিফোন লাইন কেটে যায়। ফলে দুর্ভোগ পোহাতে হয় সাধারণ নগরবাসীকে। এ থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় নেই। সেবামূলক সংস্থাগুলো নিজেদের মত করে বছর ধরে উন্নয়নের কাজ করে থাকে। সমন্বয়হীনতার ফলে এই দুর্ভোগ পোহাতে হয় নগরবাসীকে। কখনও কখনও প্রাণহানির মত মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে থাকে। মগবাজারে ঘটে যাওয়া ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের স্থানের সামনের রাস্তায় ওয়াসার ড্রেন নির্মাণের কাজ চলছে। ভবনের সামনে অন্তত ৬ ফুট গভীর করে গোলাকার ড্রেন স্থাপন করা হয়েছে। খোঁড়াখুড়ির কারণে সেখানে বিদ্যুৎ লাইন, গ্যাস লাইন ও টেলিফোন লাইনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ব্যাপারে ওয়াসার মগবাজার মডস জোন-৬ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। 

                          

বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে শর্ট সার্কিটের মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে অহরহ। গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি মগবাজারের দিলু রোডের একটি ভবনে শর্টসার্কিটের মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে শিশুসহ তিনজন মারা যায়। গত বছরে সারাদেশে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি ঘটেছে ১৮৬ জনের।

এ ব্যাপারে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: আমীর আলী বলেন, যে কোনো একটি ভবনে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার আগে সেটি তদন্ত ও পরিদর্শন করা হয়। বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার পর সেটির কোনো ক্রুটি হচ্ছে কি না, তাও একটি পরিদর্শন টিম তদন্ত করে।   

                              

সার্বিক বিষয়ে সেফটি ম্যানেজমেন্ট ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার  জেনারেল (অব.) আলী আহাম্মেদ খান বলেন, আমাদের সেফটি সিকিউরিটি সিস্টেম উদ্বেগজনক। মগবাজারের ঘটনা সবার জন্য অ্যালার্মিং। সঠিক নজরদারি ও ব্যবস্থাপনা না থাকলে এমন ঘটনা ঘটতেই থাকবে। ঢাকাসহ সারাদেশেই উন্নয়নের কাজ চলছে। দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পায়ন হচ্ছে। এসব কাজে অনেক ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড বা নির্মাণ কাজে ফায়ার নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। যে কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।

ফায়ার সার্ভিস এ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, একটি ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রয়েছে কি না-তা ফায়ার সার্ভিস যথাযথ তদন্ত করেই রিপোর্ট দেয়। তবে একটি ভবনে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগের বিষয়ে সমন্বয় করা গেলে কাজটি ভাল হতো। কিন্তু সেটি করতে গেলে তো নিজের কাজটিই সঠিকভাবে হবে না। তাই ফায়ার সার্ভিস তার নিজ কাজটি যথাযথভাবে পালন করছে। 

ইত্তেফাক/এসআই