বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ম্যাজিক থামিয়ে কোয়ার্টারে সুইজারল্যান্ড

আপনি কি ফুটবলপিয়াসু? উত্তর যদি হয় 'হ্যাঁ' তাহলে বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, এমন একটা রাত শেষ কবে দেখেছিলেন? খুঁজে পাচ্ছেন না তো? গ্যালারিতে গ্যালারিতে কানফাটা চিৎকার করে বেড়ানো একসময়ের তাগড়া যুবক, যিনি এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ, খুব সম্ভবত তিনিও স্মৃতি হাতড়ে বেড়াবেন এমন একটা রাত খুঁজে পেতে। ফুটবল, যার পরতে পরতে লেখা নাটকীয়তা, গতি আর ছন্দের মিশেল, যার প্রতিমুহুর্তে অনিশ্চয়তা, সে খেলাটার কি অবাক প্রদর্শন! 

কেউ কেউ সতর্কবাণী দিচ্ছেন। বলছেন, দুর্বল চিত্তের লোকজন এবারের ইউরো দেখবেন না। একেবারে ভুলও বলেন নি। আপনার প্রতিক্রিয়ার সীমারেখা যদি না জানেন, তাহলে হয়তো এই ফুটবল আপনাকে পৌঁছে দিবে জীবনের চরমসীমায়।

ওদিকে, করোনার চোখরাঙানি উপেক্ষা করে গ্যালারিতে হাজির হওয়া হাজারো মানুষের ভীড়ে কতোজনের চোখ বেয়ে জল গড়িয়েছে, তার খবর কে রাখে! কাদের বেশি জল গড়িয়েছে, ফ্রান্স সমর্থকদের নাকি সুইজারল্যান্ড সমর্থকদের? এমন একটা ম্যাচ শেষে দু'পক্ষের চোখেই অশ্রুবাণ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক, এটাই নিয়ম। দুঃখেই সবসময় কাঁদবেন কেন, আনন্দেও তো কতোজানের চোখে জল গড়ায়! গ্যালারিতে সুইস সমর্থকদের কান্না আপনার নজর এড়ায়নি নিশ্চয়ই।

এই সুইজারল্যান্ড দলটার কথাই ভাবুন। এ ম্যাচে নিশ্চিতভাবেই আন্ডারডগ। প্রতিপক্ষ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। এবারের ইউরোরও সেরা দাবিদার। তাদের বিপক্ষে শুরুতেই লিড নেয়ার আনন্দটাও যে পেয়েছে সুইসরা! সেফারোভিচের গোলে ম্যাচের মাত্র ১৫ মিনিটে লিড নেয় সুইজারল্যান্ড।

এমবাপ্পে-গ্রিজম্যান-বেনজেমারা কম চেষ্টা করে নি গোলটা শোধ করতে। একেবারে মুহুর্মুহু আক্রমন যাকে বলে। কিন্তু প্রথমার্ধ্বে আর কোন গোল হয় নি। দ্বিতীয়ার্ধ্বে ৫ মিনিটের একটা ঝড় বয়ে যায়। যে ঝড়ে লন্ডভন্ড সুইস তীর। অথচ ঝড়টা ছিল তাদের অনুকূলেই। কিন্তু পেনাল্টি ঠেকিয়ে নায়ক বনে যান ফরাসী গোলকিপার হুগো লরিস। 

এরপর মাত্র ২ মিনিটের ব্যবধানে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে পরপর ২ গোল করে স্পটলাইটের সব আলো কেড়ে নেন করিম বেনজেমা। স্কোরলাইন ২-১। ৭৫ মিনিটে সেটিকে ৩-১ করেন পল পগবা। মাঝমাঠ থেকে তার বুলেট গতির শট ঠেকানোর সাধ্য ছিল না সুইজারল্যান্ডের গোলকিপারের।

ম্যাচটা ওখানেই শেষ হতে পারতো, হয়নি। বরং শেষ ১০টা মিনিটের জন্যই জমে ছিল যত নাটকীয়তা। ৮১ মিনিটে সেফারোভিচ তার এবং দলের ২য় গোলটি করেন। আর ম্যাচের একেবারে শেষ বাঁশি বাজার আগমুহুর্তে গোল করে, ম্যাচের দৈর্ঘ্য আরো ৩০ মিনিট বাড়ান গাব্রানোভিচ।

তবে, ফুটবলে ভাগ্যটাও লাগে। যোগ করা সময়ে যেমন কিংসলে কোম্যানের শটটা বারে লেগে না ফিরলে ফরাসীদের মুখেই হাসি ফুটতো। কিংবা ১১৮ মিনিটে অলিভিয়ার জিরুর হেডটা হতে পারতো আরো নিখুঁত। কিছুতেই যখন কিছু হয়নি, ১২০ মিনিট শেষে যখন স্কোরলাইন ৩-৩, তখন পেনাল্টি শ্যুটআউটে যাওয়া ছাড়া আর বিকল্প কি?


ট্রাইবেকারে নিজেদের ৫টি শটের সবকটিতেই গোল করে সুইসরা। আগের ৪টিতে গোল করে ফরাসীরাও। মিস করেছেন কে জানেন? কিলিয়ান এমবাপ্পে। শেষ শটটা নিতে এসে দিয়েছেন সুইস গোলকিপারের হাতে। ম্যাচটাও দিয়ে এসেছেন তাদেরকে। ডুবিয়েছেন বিশ্বচ্যাম্পিয়নের তকমা নিয়ে ইউরো খেলতে আসা ফ্রান্সকে। বলা হয়, বেদনার রং নীল। ফ্রান্সের নীল জার্সিটা তাদের মুখের বেদনার ছাপটা কি আরো ফুটিয়ে তুলবে? 


ইত্তেফাক/এনএ/এএএন