ভেজালের মহামারী রুখিতে হইবে

খাদ্যে ভেজালকারী অসাধু ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়া প্রধানমন্ত্রী বলিয়াছেন যে, খাদ্যে ভেজাল দেওয়াটা আমাদের দেশে কিছু কিছু মানুষের চরিত্রগত বদ-অভ্যাস হইয়া দাঁড়াইয়াছে। ইহা বন্ধ করিতে হইবে। মানুষকে ঠকাইয়া তাহাদের জীবন ধ্বংস করিবার অধিকার কাহারও নাই। জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস উপলক্ষে রবিবার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন। তিনি বলিয়াছেন, খাদ্যে ভেজাল বন্ধে অভিযান চলিতেছে। ভবিষ্যতে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হইবে। পাশাপাশি মানুষকে সচেতন হওয়ারও আহ্বান জানাইয়াছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের যৌক্তিকতা ও যথার্থতা যে কত ব্যাপক— ভুক্তভোগী মাত্রই তাহা জানেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, চলমান ভেজালবিরোধী অভিযানের যে যিকঞ্চিত্ চিত্র গণমাধ্যমের কল্যাণে প্রত্যক্ষ করিবার সুযোগ আমাদের হইয়াছে, তাহাতে রীতিমতো আতঙ্কিত হইতে হয়—যদিও ইহা বিশাল এক ডুবোপাহাড়ের চূড়া মাত্র। নামিদামি হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ডিপার্টমেন্ট স্টোর সর্বত্রই চলিতেছে ভেজালের মহোত্সব। জীবন রক্ষাকারী বোতলজাত পানি— এমনকী শিশুখাদ্য দুগ্ধ পর্যন্ত কিছুই রক্ষা পায় নাই ভেজালের কারবারিদের প্রাণঘাতী আগ্রাসন হইতে। অবস্থা এমন দাঁড়াইয়াছে যে, যেখানেই হাত দেওয়া হইতেছে, সেখান হইতেই যেন ভেজালের লাভার উদ্গীরণ ঘটিতেছে। মাত্র একদিন আগে যে-হোটেলকে ‘এ’ রেটিং দেওয়া হইয়াছে, পরদিন সেই হোটেলেই পাওয়া যাইতেছে পচা-বাসি খাবার। আর ভিতরের পরিবেশ যে কতটা অস্বাস্থ্যকর তাহা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। ফুটপাতের খোলা খাবার ও সাধারণ মানের খাবারের দোকানগুলির অবস্থা সহজেই অনুমেয়। সারা দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ নিয়মিতভাবে যেইসব খাবারের উপর নির্ভরশীল— তাহার এই নৈরাজ্যকর অবস্থা কোনোভাবেই মানিয়া লওয়া যায় না। 

ভেজালকারীরা কতটা বেপরোয়া তাহারও অকাট্য কিছু প্রমাণ পাইয়াছেন অভিযানের সহিত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ। দেখা গিয়াছে, কয়েকদিন আগে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পচা-বাসি-ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্য বিক্রয়ের অভিযোগে যে হোটেলটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হইয়াছে, একসপ্তাহের ব্যবধানে সেই হোটেলে আবারও তাহার পুনরাবৃত্তি চলিতেছে। বোতলজাত পানির অবস্থা আরও শোচনীয়। চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কোনোপ্রকার পরিশোধন ছাড়াই ওয়াসার সরবরাহকৃত পানি বোতলজাত করিয়া তাহাকে নিরাপদ পানি হিসাবে বিপণনের অভিযোগে বন্ধ করিয়া দেওয়া নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানগুলিও ঠিক একই কাজ করিতেছে। আর ইহার খেসারত দিতে হইতেছে সাধারণ মানুষকে। পরিসংখ্যান বলিতেছে, দেশি-বিদেশি হাসপাতালগুলিতে জটিল রোগীর সংখ্যা দিনদিন বাড়িয়া চলিয়াছে। কেন এমন হইতেছে— প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে তাহার কিছুটা আভাস রহিয়াছে। ইহা সত্য যে, কয়লা ধুইলেও ময়লা যায় না। তবে নিশ্ছিদ্র নজরদারির বিষয়টিও কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নহে। সরিষার মধ্যে ঘাপটি মারিয়া থাকা ভূতদের কারণে যেন জনস্বাস্থ্য অধিকতর ঝুঁকির মুখে না পড়ে—, তাহা অবশ্যই নিশ্চিত করিতে হইবে। স্বস্তির বিষয় হইল, সরকার এই ব্যাপারে পূর্ণ সচেতনই শুধু নহে, বিষয়টিকে যে খুবই গুরুত্বের সহিত দেখা হইতেছে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেই তাহা স্পষ্ট হইয়া গিয়াছে। প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলিয়াছেন যে, ইতোমধ্যে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করিয়া আমরা সফলতা অর্জন করিয়াছি। মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চলিতেছে। খাবারে ভেজাল দেওয়াটা নিঃসন্দেহে গুরুতর অপরাধ ও দুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে। অতএব, এই ব্যাপারে কোনো আপস নহে।