পাকস্থলিতে ইয়াবা নিয়ে শিশুরা ঢুকছে ঢাকায়

দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযান এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে চার শতাধিক মাদক কারবারি নিহত হওয়ার পরও থেমে নেই ইয়াবা পাচার। এখন টেকনাফ থেকে ঢাকায় ইয়াবার চালান আনা হচ্ছে শিশুদের পেটে (পাকস্থলি) করে। টাকার লোভে অনেক শিশু জড়িয়ে পড়েছে এ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। প্রতি চালানের জন্য শিশুরা পাচ্ছে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্যই জানিয়েছে পেটে ইয়াবা বহনকারী শিশু  জসিম ও শাজহান। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগের একটি টিম শনিবার রাতে রাজধানীর শাহ আলী ও মিরপুর এলাকা থেকে ওই দুই শিশুসহ ৮ জনকে গ্রেফতার করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৩০ হাজার পিস ইয়াবা। এর মধ্যে দুই শিশুর পেট থেকে উদ্ধার করা হয় প্রায় ৫ হাজার পিস ইয়াবা।

গ্রেফতারকৃতরা হচ্ছে ইয়াবা কারবারি লোকমান হোসেন, মোঃ রঞ্জু, শাহিদা বেগম,  ইউনুছ মিয়া, মোছাঃ শাহনাজ বেগম, মারিয়া আক্তার রিনা এবং শিশু জসিম ও শাহাজাহান। গোয়েন্দা পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য লোকমানসহ ৬ জনকে গতকাল  ২ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে। শিশু হওয়ায় আদালত জসিম ও শাজহানকে সংশোধনাগারে পাঠিয়েছে।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) মশিউর রহমান বলেন, জসিম ও শাজাহানের বাড়ি কক্সবাজারের টেকনাফে। আটকের পর তারা অকপটে স্বীকার করেছে তারা পেটে ইয়াবা বহন করে ঢাকায় নিয়ে আসে। ঢাকায় আনার পর তাদের কাছ থেকে ইয়াবার চালান গ্রহণ করে লোকমান হোসেন ও রঞ্জু। চালান পৌঁছে দেওয়ার পর তাদের চুক্তিমতো টাকা দেওয়া হয়েছে। যার পরিমাণ ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। ইতিপূর্বে তারা চারবার পেটে করে ইয়াবা বহন করে ঢাকায় পৌঁছে দিয়েছে। ইয়াবা বহনের ব্যাপারে তারা জানিয়েছে, ৫০ থেকে ৬০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট একসাথে ক্যাপসুল বানানো হয় ( যারা ইয়াবা দেয়, তারাই এ কাজটি করে দেয়)। এরপর ৫০-৬০টি ক্যাপসুল খেয়ে পেটে করে টেকনাফ থেকে ঢাকায় নিয়ে আসে। কখনো বাসে আবার কখনো ট্রেনে করে ঢাকায় আসে। তবে ইয়াবা ক্যাপসুল পেটে নেয়ার পর তারা অন্য কোনো খাবার এমনকি এক ফোঁটা পানিও খেতে পারে না। ঢাকায় এসে নির্ধারিত বাসায় গিয়ে তারা প্রচুর পরিমাণে পানি পান করে। আর এরপরই ইয়াবার ক্যাপসুলগুলো পায়ুপথ দিয়ে বেরিয়ে আসে। পরে সেগুলো ধোয়ার কাজটি তাদেরই করতে হয়। ইয়াবার চালান বুঝে পাওয়ার পরই তাদের দায়িত্ব শেষ হয়।

গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, শিশুরা জানিয়েছে তাদের মতো অনেক শিশুই টেকনাফ থেকে পেটে করে ইয়াবার চালান ঢাকায় নিয়ে আসে। তারা একা কখনো ঢাকায় আসে না। সঙ্গে থাকে মাদক কারবারিদের লোকজন।

উপ-কমিশনার (উত্তর) আরো বলেন, গ্রেফতারকৃত লোকমান ও রঞ্জু হলো মূল ইয়াবা কারবারি। এর মধ্যে লোকমানের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও রঞ্জুর বাড়ি শরিয়তপুরের গোসাইরহাট। তারাই টেকনাফ থেকে পাকস্থলি (পেট) ভাড়া করে ইয়াবার চালান ঢাকায় নিয়ে আসে। তারা কখনো শিশু, কখনো বা বোরকা পরা নারীদের ইয়াবা বহনে ব্যবহার করে। পাশাপাশি দিনমজুরদের ( টুকরি, কোদাল সাথে থাকে, যাতে সবাই বুঝতে পারে তারা গ্রাম থেকে শহরে কাজে যাচ্ছে) ব্যবহার করেও ইয়াবার চালান আনে। এরা প্রথমে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম আসে। সেখান থেকে ভেঙে ভেঙে বিভিন্ন যানবাহনে করে ঢাকায় আসে।

বর্তমানে কতসংখ্যক শিশু ঝুঁকিপূর্ণ ইয়াবা বহনে জড়িয়ে পড়েছে— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গ্রেফতারকৃতদের রিমান্ডে আনা হয়েছে। তাদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করলে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে। তিনি আরো বলেন, অভিযানকালে লোকমান ও রঞ্জুর অন্যমত সহযোগী সবুজ পালিয়ে যায়। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। সবুজ পল্লবী থানার অস্ত্র মামলার আসামি বলে তিনি জানান।

এ ব্যাপারে রাজধানীর তেজগাঁও কেন্দ্রীয় মাদক নিরাময় কেন্দ্রের চিফ কনসালটেন্ট ডা. সৈয়দ ইমামুন হোসেন বলেন, পাকস্থলিতে  ইয়াবা বহনে নানা ঝুঁকি রয়েছে। ইয়াবাগুলো এভাবে বহন করা হয়, যাতে পেটের ভেতর হজম হয় না। ইনট্যাক মলদ্বার দিয়ে বেরিয়ে আসে। কিন্তু ফয়েল (যা দিয়ে ইয়াবা মোড়ানো থাকে) যদি লিক হয়ে যায়, তাহলে ড্রাগটা শিশুর শরীরে চলে যাবে। এর ফলে ড্রাগের ওভার ডোজে তার মৃত্যু হবে। দেখা গেলো, ফয়েল লিকও করলো না, আবার মলদ্বার দিয়ে বেরও হলো না, সেক্ষেত্রেও মৃত্যু ঝুঁকি রয়ে যায়।