অটিজম শনাক্ত বিশ্বের প্রথম শিশু

আমাদের দেশে বর্তমানে অটিজম আর খুব বেশি অচেনা সমস্যা নয়, কিন্তু ১৯৪৩ সালের পূর্ব পর্যন্ত বিশ্বের কোনো দেশেই কারো কাছে অটিজমের নাম জানা ছিল না। ১৯৩৮ সালে ‘ডোনাল্ড গ্রে ট্রিপলেট’ নামে এক শিশুর বাবা ড. লিও ক্যানার নামের এক মনোচিকিত্সকের কাছে তার ছেলের কিছু আচরণের কথা জানিয়ে চিঠি লেখেন। এ সময় ছেলেটির বয়স ছিল পাঁচ বছরের কিছু বেশি। ডোনাল্ড নামের এই ছেলেই বিশ্বের অটিজম শনাক্ত প্রথম শিশু। ডোনাল্ডের বাবা ছিলেন একজন নামী আইন বিশেষজ্ঞ। মা ছিলেন স্কুলশিক্ষিকা। ১৯৪৩ সালেই গবেষণা সংবাদটি প্রকাশিত হয়। তবে এই গবেষণায় মোট ১০টি শিশু ছিল। এদের মধ্যে তিনটি মেয়ে বাকি সাতটি ছেলে। উল্লেখ্য, ডোনাল্ডের বাবার চিঠিটি ছিল ৩৫ পৃষ্ঠার টাইপ করা এক বিবরণপত্র। এই বিবরণে লেখা ছিল শিশুর জন্ম সাল, জন্মকালীন ওজনসহ জন্মের পরের খাদ্যখাবারের কথা। এর সঙ্গে ডোনাল্ডের আচার-আচরণের বিবরণ। 

ডোনাল্ড ১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আমেরিকার মিসিসিপির ফরেস্ট শহরে জন্মগ্রহণ করে। ডোনাল্ডের জন্মকালীন ওজন ছিল সাত পাউন্ড। মায়ের বুকের দুধ এবং অন্য কিছু সাপ্লিমেন্ট খাবার দিয়েই তার খাওয়া শুরু হয়। তবে খাবারদাবার নিয়ে সব সময়ই ডোনাল্ডের সমস্যা ছিল। সময় যায়, ডোনাল্ডের বয়েস বাড়ে। শুরুর দিকে চমত্কার সব কাজের নজির রাখে সে। এক বছর বয়সে সে অনেকগুলো গানের সুর গুনগুন করতে পারত। দুই বছর বয়সে ডোনাল্ড তার শহরের অনেকগুলো বাড়ির নাম মনে করতে পারত। ডোনাল্ড সবগুলো ইংরেজি হরফই বলতে পারত। সে ১০০ পর্যন্ত গণনাও করতে পারত। এ সময় তাকে পরিবার থেকে ছোট ছোট কবিতা আবৃতির জন্য উত্সাহ দেওয়া হয়। ডোনাল্ড ৩০টির মতো প্রেসবাইটেরিয়ান ধর্মীয় স্তব এবং ২৫টি প্রশ্ন ও প্রশ্নোত্তর জানত। কিন্তু এ সময় মা-বাবা লক্ষ করেন, কীভাবে প্রশ্ন জিগ্যেস করতে হয় তা সে শেখেনি। প্রশ্নের উত্তর দেওয়াও সে শেখেনি।

একসময় ডোনাল্ড ছবির বিষয়ে খুব উত্সাহী হয়ে ওঠে। এ সময় সে মা ও বাবার দুই দিকের পরিবারের পূর্বপুরুষ, নিকটাত্মীয়দের ছবি চিহ্নিত করতে পারত। সে সময়কার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ছবিও ডোনাল্ড শনাক্ত করতে পারত। কিন্তু ধীরে ধীরে ডোনাল্ডকে দেখে একা একা মনে হতে থাকে। আরো মনে হতে থাকে, সে যেন নিজের মধ্যেই অনেকটা আত্মমগ্ন হতে থাকে। একাকী থাকতে দিলেই সে খুশি থাকে বেশি। ছোটবেলায় মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য ডোনাল্ড কখনোই কান্নাকাটি করেনি। মা বাড়িতে এলেন বা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন—কোনোটিতেই সে আগ্রহ দেখাত না। বাবার বেলায়ও ছিল একই রকম আচরণ। খেলার সাথি, মা-বাবা কাউকে দেখেই সে খুশি হতো না। আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার জন্যও উত্সাহ দেখাত না।

দুই বছর বয়সে তার মধ্যে কিছু বিষয়ে বাতিকের উদ্ভব হয়। যেমন—ব্লক বা গোলাকার কোনো ডেকচি এবং চাকাজাতীয় বস্তুর ঘূর্ণনের দিকে তার প্রচণ্ড আগ্রহ দেখা যায়। কিন্তু তেপায়া সাইকেল, দোলনা প্রভৃতির প্রতি দেখায় অনাগ্রহ। তেপায়া সাইকেলে সে প্রচণ্ড ভয় পেত। জোর করে তেপায়া সাইকেলে চড়িয়ে দিলে কাউকে সাহায্য করতে হতো। ডোনাল্ডকে একবার স্লাইডিং করার জন্য খেলার মাঠে নিয়ে গেলে মাঠে অন্য শিশুরা খেলছে দেখে স্লাইডিংয়ে কোনোই আগ্রহ দেখায় না, বরং ভয় পায়। কিন্তু লক্ষ করা গেল, পরদিন একাই গিয়ে মই বেয়ে ওপরে উঠে স্লাইড করতে থাকে। তবে এ সময় কেউ মাঠে ছিল না।

ধীরে ধীরে ডোনাল্ডের মধ্যে মাথা দোলানোর অভ্যাস গড়ে ওঠে। অন্যমনস্কতাও বাড়ে। আর মনে হতে থাকে, সে যেন কিছু চিন্তা করছে। ক্যানারের নিরীক্ষণ থেকে জানা যায়, তার মধ্যে বেশ স্বতঃস্ফূর্ততার  সীমাবদ্ধতা ছিল এবং সেটা ছিল খুবই লক্ষণীয় পরিমাণের। এর সঙ্গে হাতের আঙুল ঘোরানো, এদিক-ওদিক মাথা ঝাঁকানো প্রভৃতি স্টেরিওটাইপ আচরণ তার মধ্যে দেখা দেয়। ডোনাল্ডকে নানা সময়ে ক্যানারের কাছে নেওয়া হয়। কিন্তু মা-বাবা চাননি সে কোনো আলাদা প্রতিষ্ঠানের গ্রুপ হোমে থাকুক। বড় হয়ে ডোনাল্ড একা এবং নিজে নিজেই থাকতে শুরু করে তার জন্ম শহরে। প্রথম দিকে তার প্রতিবেশীদের ডোনাল্ডকে বুঝতে অসুবিধা হয়। ধীরে ধীরে তারা তাকে বুঝতে পারে এবং তার সুরক্ষায় সজাগ হয়।

n লেখক : ভূগোলের সাবেক অধ্যাপক,

নটর ডেম কলেজ, ঢাকা। বর্তমানে

টরোন্টো ডিসট্রিক্ট বোর্ডে কর্মরত