আমরা যেভাবে কড়াকড়ি করি, অনেকেই তা করে না

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর খুবই আশাপ্রদ একটি অঙ্গীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে পাচার করা সব টাকা/অর্থ তিনি দেশে ফিরিয়ে আনবেন। এতে বিনিয়োগ বাড়বে। তিনি আরও বলেছেন, এই উদ্যোগে তিনি সফল হবেন। অনেকের সঙ্গে তিনি কথাও বলেছেন বলে জানিয়েছেন। অর্থমন্ত্রীর এই অঙ্গীকারের পর জানার দরকার এভাবে কত টাকা দেশে ফিরে আসবে। বলা বাহুল্য, বিশাল অঙ্কের টাকা। টাকার অঙ্ক শুনলে যেকোনো মানুষের অবাক হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। আসলে কত টাকা তার হিসাব কেউ দিতে পারবে না। এই তথ্য আমার মনে হয় সরকারের কাছে নেই, অর্থমন্ত্রীরও নেই। ‘কালো টাকার’ও (ব্ল্যাক মানি) কোনো হিসাব কারো কাছে নেই। আমাদের দেশের কত ‘থিঙ্ক ট্যাঙ্ক’ আছে, গবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে। তাদেরও কারো কাছে পাচারকৃত টাকার অথবা কালো টাকার কোনো হিসাব আছে বলে শুনিনি। সবই ‘গসিপ’। আন্দাজের কথা। মুখে মুখে প্রচারিত হয় যে, দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। গেল নির্বাচনের সময়েও একই অভিযোগ করেছেন নানা পদের লোকেরা। এর মধ্যে বিরোধী দল আছে, গবেষক আছে, সমাজকর্মী আছে, আছে সাধারণ  মানুষও। বস্তুত এই বিষয়টি এখন জাতীয় আলোচনার বিষয় এবং সরকারের কাছে একটা বড় এজেন্ডা বলে মনে হয়। সরকার এবার বলেছে, দুর্নীতির ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গৃহীত হয়েছে। সরকারি দলের নির্বাচনী অঙ্গীকারেও এই বিষয়টি আছে। বলা বাহুল্য, দুর্নীতির সঙ্গেই জড়িত কালো টাকা এবং অর্থপাচার। শুধু দুর্নীতি নয়, অন্য পন্থার টাকাও যে দেশের বাইরে পাচার হচ্ছে না তাও হলফ করে কেউ বলতে পারবে না। এসব কারণেই কেউ পাচার করা অর্থের পরিমাণের কথা বলতে পারে না। তবে  ইদানীং আমরা বিদেশি গবেষণা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে চমকপ্রদ সব খবর/তথ্য/পরিসংখ্যান পাচ্ছি এবং  সেগুলো খবরের কাগজে, মিডিয়ায় ফলাও করে ছাপা হচ্ছে। মানুষও এগুলো বিশ্বাস করে নিচ্ছে। টাকা পাচার এবং দুর্নীতি এ দুটো বিষয় এখন বহুল চর্চিত বিষয়। এমতাবস্থায় এসব সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণা থাকতে বাধা নেই।

অর্থ পাচারের বিষয়ে গত কয়েক বছর যাবত্ ওয়াশিংটনভিত্তিক একটি গবেষণা সংস্থা নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করে যাচ্ছে। এই তথ্য শুধু আমাদের দেশের নয়, সমগ্র বিশ্বের ওপরই তারা তথ্য প্রকাশ করছে। এবার ‘গ্লোবাল ফিনান্সিয়েল ইনটিগ্রিটি’ নামীয় গবেষণা সংস্থাটি যে তথ্য দিয়েছে তা ১৪৮টি দেশের ওপর। দেখা  যাচ্ছে, এতগুলো দেশের মধ্যে ২০১৫ সালে অর্থ পাচারের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ ছিল ১৯তম। কোন দেশ তাহলে প্রথম। প্রথম হয়েছে চীন যারা এখন ‘পিপিপি’-এর ভিত্তিতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির  দেশ। ২০১৫ সালে কত টাকা বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে? হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। বিশাল পরিমাণ টাকা। তবে উল্লেখ্য, এই পরিমাণটি ২০১৪ সালের তুলনায় কম। ঐ বছর পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ ছিল ৭৭ হাজার কোটি টাকা। আরও তথ্য আছে। ‘জিএফআই’-এর তথ্য মোতাবেক, ২০১৫ সাল পর্যন্ত দশ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে পাঁচ লাখ ২২ হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা সর্বসমেত। ভাবা যায়, এই টাকা যদি দেশে আনা যায় তাহলে দেশে বিনিয়োগের একটা বিপ্লব ঘটে যাবে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের পরিমাণ হবে আকাশচুম্বী। বলা বাহুল্য, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেকগুলো প্রশ্ন। প্রশ্ন নাম্বার এক, কারা এই অর্থ পাচার করেছে? কী পদ্ধতিতে তা পাচার করা হয়েছে? দেশে ‘মানি লন্ডারিং প্রিভেনশন আইন’ বলে একটা এত শক্ত আইন থাকার পরও কী করে অর্থপাচারের এই ঘটনাটি ঘটল এবং ঘটছে? পরের      প্রশ্ন, এই পাচারকৃত অর্থ কোথায় যাচ্ছে? সেসব দেশে কি ‘মানি লন্ডারিং প্রিভেনশন আইন’ নেই? প্রশ্ন আছে আরও। এসব টাকা কি বিনা বিচারে দেশে আনা হবে? যদি তাই হয়, তাহলে    দেশের ভেতরে যে ‘কালো টাকা’ আছে— তাদের বেলায় কী হবে? তারাও কি মুক্তি পাবে? এ ধরনের হাজারো প্রশ্ন এখন মানুষের মনে।

বলা হয়েছে, ‘ওভার ইনভয়েসিং’ এবং ‘আন্ডার ইনভয়েসিং’ হচ্ছে প্রধানতম মাধ্যম। দ্বিতীয় হচ্ছে, হুন্ডি। তৃতীয় সারিতে পড়ে বিবিধ পন্থা। এতদিন আমরা শুনেছি শুধু ‘হুন্ডির’ কথা। ‘হুন্ডি’কেই সবাই দোষারোপ করেছে। হুন্ডিওয়ালারা দেশের শত্রু—একথা পাকিস্তান আমল (১৯৪৭-৭১) থেকেই শুনে আসছি। এখন বিদেশি গবেষণা সংস্থার কল্যাণে জানতে পারছি ‘ওভার ইনভয়েসিং’ (অতি মূল্যায়ন) এবং ‘আন্ডার ইনভয়েসিং’ (অবমূল্যায়ন) হচ্ছে প্রধানতম মাধ্যম। বলা বাহুল্য, এসব জড়িত আমদানি-রপ্তানি ব্যবসার সঙ্গে। বিদেশি কম মূল্যের দ্রব্যাদি বেশি মূল্য দেখিয়ে দেশে আমদানি করার নাম ‘ওভার ইনভয়েসিং’। এর উল্টোটা হচ্ছে ‘আন্ডার ইনভয়েসিং’। এখন তাহলে কী আমরা বলব, এই পাচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং আমদানি ও রপ্তানিকারকরাই এর জন্য মূলত দায়ী? দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মচারী যারা ঘুষ খায় তারা তো ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা করে না। তাহলে তাদের টাকা অথবা অন্যান্য পেশার লোকেরা তাদের উপার্জিত অথবা অনুপার্জিত টাকা কীভাবে দেশ থেকে পাচার করে ‘বেগম নগরী’, ‘সচিব নগরী’, ‘সেকন্ড হোম’ ইত্যাদি নামজড়ানো শহর গড়ে তুলছে? স্পষ্টত বোঝা যায় এটা একটা বিশাল নেটওয়ার্ক—আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, অসত্ লোকজন, প্রভাবশালী লোকজনদের একটা নেটওয়ার্ক। এই কাজ তারা করতে পারতেন না যদি না ব্যাংকগুলো ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় সাহায্য-সহযোগিতা করত। আবার আরও বেশি সম্ভব হত না যদি না কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সরকারের কমার্শিয়েল অডিট এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অডিট ঠিকভাবে কাজ করত। তবে কি সবাই মিলে ‘প্রাইমারি এ্যাকুমেলেশন অব ক্যাপিটেল’ প্রক্রিয়ায় সাহায্য ও সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে? একথা জানা, অনেকেই ৪০ কোটি টাকার মেশিনারি আমদানি করেন ৬০-৮০ কোটি টাকায়। ৪০ কোটির ওপরের টাকা হয় পাচার এবং তা যায় একটা গন্তব্যস্থলে।

দেখা যাচ্ছে, এসবে সাহায্য করার জন্য অনেক দেশ আছে। যদি তা না হতো তাহলে ফিলিপাইনের ‘আরসিবিসি’ ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের চুরি করা টাকা জমা হতে পারত না। মানি লন্ডারিং প্রিভেনশনের মৌলিক শর্তগুলো মানা হলে সেখানে অর্থ জমা হতে পারত না, এবং সেখান থেকে টাকা তোলাও যেত না। মুশকিল হচ্ছে, এ ধরনের সুবিধা বহু দেশই দিয়ে যাচ্ছে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, ব্যাংকক পূর্ব দিকে, অস্ট্রেলিয়া পূর্ব দিকে, পশ্চিমে রয়েছে দুবাই, ইউরোপ, আমেরিকা ও কানাডা ইত্যাদি দেশ এবং অঞ্চল। সর্বোপরি রয়েছে সুইস ব্যাংক। রয়েছে অনেক দ্বীপ রাষ্ট্র যেখানে টাকা রাখা খুবই সহজ। কম্পানি খোলা, পাচারকৃত টাকা রাখা, তা বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ করা এবং তা বিনা ট্যাক্সে— এটা সম্ভব ঐ দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোতে যাদেরকে ‘ট্যাক্স হেভেন’ বলা হয়। দুইদিন ধরে উপমহাদেশীয় কাদের কাদের সেখানে টাকা আছে তা খবরের কাগজে ছাপা হয়। অনেক দেশ চায় শুধু ডলারের বিনিয়োগ। তারা অর্থের উত্স খোঁজে না। যদি খুঁজত তাহলে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর তাবত্ উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশে এত ট্রিলিয়ন, ট্রিলিয়ন (লাখ কোটি) টাকা পাচার হতে পারত না। আমরা যেভাবে কড়াকড়ি করি, অন্যরা অনেকেই তা করে না। আমাদের দেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সময় গ্রামের একজন স্কুল শিক্ষককেও ঘোষণা দিতে হয় যে তিনি মার্কিন নাগরিক নন এবং মার্কিন দেশে তার কোনো ব্যবসা নেই! একে ‘ফাটকা’ বিধি বলা হয়।

আমি মনে করি, আমদানি-রপ্তানি ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে পাচার বন্ধ করা কঠিন। কোন পণ্যের মূল্য কোন দেশে কত এবং কখন কত, কারা কারা বিক্রেতা, কারা কারা ক্রেতা এসব তথ্য আজকাল সহজেই পাওয়া যায়। আমাদের ব্যাংকাররা জানে, দেশের ব্যবসায়ীরা জানে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানে। আমাদের বিদেশস্থ দূতাবাসগুলো জানে। এই পণ্যের দরটা নিয়মিত মনিটর করলে অনেক ফল পাওয়া যায়। আরেকটা বিষয় আছে। এখন আমাদের দেশের অনেকেই যারা আমদানিকারক, তারাই রপ্তানিকারক। অনেকের বিদেশে অফিস আছে। এর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক রপ্তানিকারকদের রপ্তানির ওপর একটা ‘রিটেনশন কোটা’ দেয় যা বৈদেশিক মুদ্রায়। এটাও পাচারে সহযোগিতা করে। সবচেয়ে বড় কথা হলো— টাকা যদি বাইরে, বিদেশের ব্যাংকে রাখা যায়, বিদেশে যদি টাকা বিনা নিয়ন্ত্রণে বিনিয়োগ করা যায়, বাংলাদেশিরা যদি বিদেশে বাড়ি-ঘর করতে পারে— তাহলে শত চেষ্টা করেও পাচার বন্ধ করা যাবে না। ছিটেফোঁটা অর্থ দেশে ফিরতে পারে। সবাই বলে দেশের পরিস্থিতি সহায়ক হলে টাকা দেশে ফেরত আসবে। আমি নিশ্চিত নই। ‘পরিস্থিতি সহায়ক’ বলতে এরা কী বোঝায় তা পরিষ্কার নয়। এমতাবস্থায়, আমরা অপেক্ষা করব এমন সুদিনের জন্য যখন বিদেশ থেকে পাচারকৃত টাকা দেশে ফেরত আসতে থাকবে।

n  লেখক: অর্থনীতিবিদ এবং সাবেক শিক্ষক,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়