আসুন, বাংলাভাষাকে বিকশিত করি

আফসানা রিজোয়ানা সুলতানা

শুরু হয়ে গেল ভাষার মাস। পৃথিবীতে বাংলাদেশই একটিমাত্র দেশ যেখানে  ভাষার জন্য আলাদাভাবে একটি দিবস পালন করা হয়।  মাসব্যাপী ভাষার মাস হিসেবে পালন করে পুরো ফেব্রুয়ারি  মাসকে। এই গ্রহের অন্য আরও দুই শতাধিক দেশ যা করে না তা আমাদের করার যুক্তিসঙ্গত কিছু কারণও আছে। কারণ আমরাই বুকের তাজা রক্ত ঝরিয়ে তবেই অর্জন করেছিলাম বাংলাভাষায় কথা বলার অধিকার। আমরা সবাই জানি ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন হয়। ছাত্ররা ১৪৪ ধারা জারি অমান্য করে রাস্তায় নামলে শহীদ হন সালাম, রফিক, সফিক, বরকতসহ জাতির আরও অনেক সূর্য-সন্তানেরা। কিন্তু আমরা সেদিনও বাংলাভাষায় কথা বলার সাংবিধানিক অধিকার পাইনি। তবে সেদিন থেকেই বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়ে গেছিল। তার দু’বছর পর ৭ মে ১৯৫৪ সালে পাকিস্তানের গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষার স্বীকৃতি দেয়া হয়। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া হয় তারও দু’বছর পর ২৯শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬ সালে। অর্থাত্ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে পেতে, বিশ্বের দরবারে বাংলাভাষাকে পরিচিত করাতে আমাদের চার বছরেরও বেশি সময় লেগেছিল। জাতি হিসেবে আমরা এতটা ত্যাগ স্বীকার করতে পেরেছিলাম, ধৈর্য ধারণ করেছিলাম, জীবন দিয়েছিলাম শুধু ভাষার প্রতি আমাদের অগাধ সম্মান আর ভালোবাসা ছিল বলে। আজ ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা  দিবস হিসেবে পালিত হয় বিশ্বের প্রতিটি দেশে। এই দিনটিকে স্মরণীয় করেছিলাম আমারা বাঙালিরাই। আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রথম বাংলায় ভাষণ দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাভাষাকে উপস্থাপন করেন। আমরা ১৯৭১ সালে জাতির জনকের নেতৃত্বে যে মহান যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম সে যুদ্ধে আমাদের অনেক সাহস আর উত্সাহ জুগিয়েছিল বায়ান্নর সেই ভাষা আন্দোলন।

এই যখন আমাদের বাংলাভাষার ইতিহাস তখন জাতি হিসেবে আমাদের গর্ব করা উচিত এর জন্য। আমরা গর্ব যদি করেও থাকি অন্তত আমাদের ভাষার মূল্যায়নটি সঠিকভাবে করতে পারছি না। আমাদের একটি সহজ, সরল এবং শ্রুতিমধুর ভাষা থাকা সত্ত্বেও প্রতিনিয়ত আমরা একে জটিল ও  শ্রুতিকটু করে ফেলছি। এ কাজটা হয়তো আমরা সচেতনভাবে কিংবা অসচেতনভাবেই করছি।

আমাদের দেশে বাংলাভাষার বিকৃতি কিংবা বাংলাভাষার সঙ্গে অন্য ভাষার মিশ্রণ এখন আর কোনো বড় ব্যাপারই নয়। দেশের নামকরা টিভি চ্যানেলগুলোতে উপস্থাপকেরা যখন বাংলাভাষার সঙ্গে অন্য ভাষার শব্দের মিশ্রণ ঘটিয়ে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন এবং অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিরাও এ ধরনের ভাষায় কথা বলেন তখন বাকিদের কাছে কি বার্তা পৌঁছায়। আমার ধারণা এটাকে অন্তত কেউ অপরাধের পর্যায় নেবেন না। আসলেই কি তাই? ভাষাকে বিকৃত করা কি কোনো অপরাধ নয়? আজকাল দেখা যায় তরুণ প্রজন্মের অনেকেই শুদ্ধ বাক্য এবং শুদ্ধ বানানে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার মতামত তুলে ধরতে পারেন না।

বাংলাভাষাকে বিকৃত করা কিংবা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাভাষাকে ব্যবহার না করার প্রবণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এই ভাষা আমাদের। তাই এই ভাষাকে অবিকৃতভাবে সংরক্ষণ করার দায়িত্বও আমাদের। এজন্য আমাদের শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলতে হবে এবং শুদ্ধ বানানে লিখতে হবে। বিভিন্ন স্থাপনা বা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ ইংরেজিতে না করে বাংলায় করতে হবে। কথা বলার সময় অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিদেশি শব্দ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করার সময় আমাদের সচেতন হতে হবে আমরা যেন মজা করতে গিয়ে ভাষাকে বিকৃত করে না ফেলি। এটিকে হালকাভাবে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিংবা প্রকাশ্যে বাংলাভাষা বিকৃত করাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যায় কিনা সেটি সরকার কিংবা যথাযথ কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখতে পারেন। এতে বাংলাভাষার শুদ্ধ ব্যবহারে সবাই সচেতন হবে বলেই আমার ধারণা।

n লেখক: শিক্ষার্থী, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়