বইমেলার আকাশ

সেলিনা হোসেন

একজন লেখক হিসেবে বইমেলা আমার কাছে আপন অস্তিত্বের মতোই একটি বিষয়। বাংলা একাডেমিতে ৩৪ বছর চাকরি করে অমর একুশে গ্রন্থমেলা আমি দেখেছি খুব কাছে থেকে (প্রতিদিন, প্রতিটি সময়ে। এর চরিত্র শুধু বই প্রকাশ এবং বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বইমেলা ভাষা আন্দোলনের শহীদের রক্তে প্রতিষ্ঠিত বাংলা একাডেমি কর্তৃক আয়োজিত এবং একুশে ফেব্রুয়ারির উপলক্ষ হলেও মাস জুড়ে বইমেলার আবেদন জাতীয় মননের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

এই মেলাকে আস্তে আস্তে বড় হতে দেখেছি। আশির দশকে মেলার বড় পরিবর্তন হয়। ১৯৮৪ সালে বইমেলার আনুষ্ঠানিক নাম রাখ হয় ‘অমর একুশে বইমেলা।’ তথ্য প্রযুক্তির এই সময়েও বলতে চাই বইয়ের বিকল্প নেই। বড় করে শ্বাস নিলে একুশের চেতনায় প্লাবিত হয়ে থাকা মেলা প্রাঙ্গণ জাতির ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ জায়গা।

বিভিন্ন সময়ে ভারতের তিনটি প্রদেশের বইমেলায় আমন্ত্রিত হয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। ১৯৯৬ সালে প্রথম যাই দিল্লিতে। ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ দিন ধরে চলেছিল এই মেলা। এটি ছিল দিল্লির দ্বাদশ বিশ্ব বইমেলা। মেলার থিম ছিল ‘সার্ক দেশসমূহ’। সার্ক দেশসমূহের সাতজন লেখক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। বইমেলাটির আয়োজন করেছিল ‘ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া’। মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল দিল্লির প্রগতি ময়দানে।

পরে যে বইমেলাটি আমাকে টেনেছে সেটি হলো ‘আগরতলা বইমেলা’। ২০০০ সালে অনুষ্ঠিত হয় অষ্টাদশ আগরতলা বইমেলা। ঐ বইমেলায় উপস্থিত থাকার জন্য আমি নিমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। বইমেলা আয়োজিত হয়েছিল ‘রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবন’ প্রাঙ্গণে। উদ্বোধক ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী কবি অনিল সরকার।

আরও একটি বইমেলার কথা উল্লেখ করতে চাই। এই বইমেলার আয়োজন করেছিল আদিবাসী মান্দি জনগোষ্ঠী। বইমেলার স্লোগান ছিল ‘বই হোক মান্দিদের আত্মবিকাশের মন্ত্র।’ আত্মবিকাশের অর্থ অনেক বড়, আমি মনে করি বইমেলা দিয়ে শুধু বই কেনা বা পড়ার অভ্যাসটা গড়ে তোলা নয়। এর অর্থ নিজের বিকাশকে পূর্ণাঙ্গ করা। বই আত্মবিকাশের সহায়ক শক্তি। আজকের এই আলোকিত মুখের কাছে আমার দাবি, তারা তারুণ্যপ্রদীপ্ত হয়ে বইয়ের মাধ্যম নিজেদের যোগ্য করে তুলবে।

ইদানিং বাংলাদেশের প্রকাশকরা বিভিন্ন স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বইমেলার আয়োজন করে। তাদের লক্ষ্য ছেলেমেয়েদের হাতের নাগালে বই পৌঁছে দেয়া। একবার ছায়ানট ভবনের নালন্দা স্কুলে আয়োজিত হয়েছিল বইমেলা। আমি আমন্ত্রিত অতিথি ছিলাম। দেখলাম ছেলেমেয়েরা বই কিনছে। ষষ্ঠ শ্রেণির একটি মেয়ে আমার ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ উপন্যাসটি এনে আমাকে বলল, ‘আপনার এই বইটি আমাকে দিতে হবে। আমার কাছে যে টাকা ছিল তা শেষ হয়ে গেছে।’ আমি ওর মাথায় হাত রেখে বলি, ‘মাগো তোমার যে বই ভালোলাগে তা নাও। টাকার কথা ভাবতে হবে না।’ একটি বইয়ের জন্য ও দাবি জানিয়েছে, আবদার করেনি। বইমেলার সার্থকতা এখানে।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে গিয়েছিলাম হুগলির কোন্নগরের নবগ্রাম হীরালাল পাল কলেজে। অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল কলেজের বাংলা বিভাগ। হুগলি শহরে অনেক ছোটবড় বইমেলা দেখে প্রাণমাতানো আনন্দ নিয়ে দেশে ফিরে আসি।

২০১৭ সালে গিয়েছিলাম খড়দহ বইমেলায়। চারদিকের বসতির মাঝে একটি মাঠ ব্যবহূত হয় এই মেলার জন্য। দেখলাম ৪০টি বইয়ের স্টল আছে। মাঠভর্তি মানুষের উপস্থিতি দেখে মনে হয়েছে ছোট বইমেলার বড় দিগন্ত। মেলাজুড়ে মানুষের উপস্থিতি বইয়ের হাত ধরে। এমন দৃশ্যটি আমার মাঝে সীমান্ত পেরিয়ে আসার আনন্দ আকাশ-ছোঁয়া করে ফেলে। এই বইমেলার যে বিষয়টি আমার আরও ভালো লেগেছে তাহলো ঘনবসতির মাঠে অনুষ্ঠিত মেলা মানুষের দোরগোড়ার আয়োজন। শিশুদের হাত ধরে বাবা-মায়েরা মেলায় আসছে। বই কিনছে।

২০১৯ সালের ৫ জানুয়ারি খড়গপুর বইমেলায় আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলাম। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় অনুষ্ঠিত এই মেলা আমার সামনে আর এক দিগন্ত। লেখক-পাঠকের মিলনমেলায় স্নাত হই। নিজের বইয়ের নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় পাঠককে।  

আমরা সবাই জানি বইয়ের সীমান্ত নেই। সীমান্ত ছাড়িয়ে বই পৌঁছে যায় মানুষের কাছে। এশিয়ার মানুষ হয়ে জানতে পারি আফ্রিকার সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের রূপরেখা। জানতে পারি ইউরোপ-আমেরিকা-ল্যাটিন আমেরিকার জীবন। বই মানবজাতির অক্ষয় সাধনা। লেখক: কথাসাহিত্যিক