হেমন্তের নিরুত্তাপ রোদের সকাল। আকাশের রঙের মতোই মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের গ্র্যান্ড স্ট্যান্ড ছেঁয়ে গেছে নীলাভ আভায়। ইউনিসেফের লোগো সম্বলিত নীল রঙের টি-শার্ট গায়ে জড়ানো কয়েক হাজার শিশু-কিশোরের হর্ষধ্বনিতে মুখর তখন মিরপুর স্টেডিয়াম।
মাঠে তখন হাবিবুল বাশার সুমন ব্যস্ত ফিল্ডিং প্লেসিং নিয়ে। যেন আরেকটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নেমেছেন বাংলাদেশের সাবেক এই অধিনায়ক! বল হাতে বাংলাদেশ নারী দলের পেস বোলার সুরাইয়া আজমিন ছন্দা। ব্যাটসম্যান হান্নান সরকার বোলারকে সমীহ করে বল ঠেকাচ্ছেন। পরে অবশ্য ব্যাটিংয়ে ঝড়ও তুলেছিলেন হান্নান সরকার। প্রথম ওভারেই বোল্ড হওয়া ব্যাটসম্যান বের হচ্ছেন মুখ ভার করে। আবার নতুন ব্যাটসম্যান নাচতে নাচতে ব্যাট ছাড়াই মাঠে চলে যাচ্ছেন। পরে ডেকে নিয়ে তার হাতে তুলে দেয়া হলো ব্যাট।
মূলত ফাস্ট বোলার হলেও এদিন ব্যাট হাতে তাসকিন আহমেদ বড় বড় ছক্কা হাঁকালেন। পরে মাশরাফি বিন মুর্তজার মতো ফিল্ডিংয়ে নামার আগে গোটা দলকে একত্র করে উজ্জীবিত করার চেষ্টা করলেন তাসকিন। ‘লাল সবুজের বিজয় নিশান, হাতে হাতে ছড়িয়ে দাও’ গানের তালে শরীর দুলিয়ে মাঠে প্রবেশ করেন ফিল্ডাররা।
ঠিক এমনই তুমুল আনন্দ, উত্সবের মধ্য দিয়েই গতকাল শেরেবাংলার সবুজ জমিন মাতিয়েছে সুবিধা বঞ্চিত শিশু-কিশোররা। আগামী ২০ নভেম্বর আন্তর্জাতিক ‘শিশু দিবস’ উপলক্ষে ইউনিসেফ ও বিসিবি আয়োজিত টি-১০ ম্যাচে জাতীয় দলের সাবেক ও বর্তমান তারকা ক্রিকেটারদের সঙ্গে ম্যাচ খেলেছে তারা।
ম্যাচের প্রতীকী লড়াইয়ে হোয়াইট দল ৩৫ রানে হারিয়েছে ব্লু দলকে। হোয়াইট দলের ১০৮ রানের জবাবে ৭৩ রান করতে সমর্থ হয়েছে ব্লু দল।
ম্যাচটি খেলে দারুণ খুশি তাসকিন। গতকাল ম্যাচ শেষে তিনি বলেছেন, ‘ওদের সঙ্গে খেলতে পেরে খুব ভালো লাগছে। এদের মাঝে অনেক প্রতিভা আছে। ইনজুরির কারণে অনেক দিন আমি মিরপুরে খেলি না। এই ম্যাচের মাধ্যমে আবার মিরপুরে খেললাম। তারা সবাই আমাদের সমাজের অংশ। সমাজের বিত্তবানদের উচিত এদের সাহায্যে এগিয়ে আসা। পর্যাপ্ত সুযোগ দিতে পারলে এরাও একসময় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে।’
তাসকিনের সঙ্গে হোয়াইট দলে খেলা ইকবাল হোসেন মতিঝিল এলাকার বাসিন্দা। অভাবের সংসারে পড়াশোনার পাশাপাশি একটি কুরিয়ার সার্ভিসে চাকরি করে ইকবাল। গতকাল মিরপুরে ম্যাচ খেলতে পেরে বেজায় খুশি এই কিশোর। বললেন, কি যে ভালো লাগছে বলে বোঝাতে পারবো না। মিরপুরে তাসকিন ভাইদের সঙ্গে খেলতে পারা স্বপ্ন জয়ের মতো। বোলিং করেছি উইকেট পাইনি। তবে আমরাই জিতেছি।
ম্যাচে অংশ নেয়া খেলোয়াড়, আম্পায়ার, বিসিবির কর্মকর্তাসহ সবাইকে ক্রেস্ট উপহার দেয়া হয়। শিশু দিবস পালন উপলক্ষে বেলুন উড়ানো হয়।
ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি এডুয়ার্ড বেগবেদার এই আয়োজন সম্পর্কে বলেছেন, ‘এই ধরনের পেশাদার ও সফল ক্রিকেটাদের সঙ্গে একই কাতারে সামিল হয়ে খেলার যে সাহস এই শিশুরা দেখিয়েছে তা পরিষ্কারভাবে এই দেশকে সব শিশুর জন্য উপযোগী করে গড়ে তুলতে, ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা এবং দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে থাকা সম্ভাবনারই প্রমাণ।’
আনন্দঘন কয়েক ঘণ্টার স্মৃতি নিয়ে দুপুরের মিরপুর স্টেডিয়াম ছাড়ে এসব সুবিধা বঞ্চিত শিশু-কিশোররা।