গত ১৫ নভেম্বর বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু হইবার কথা ছিল। এই দিন উখিয়ার থাইংখালীর জামতলী জি-৮ ব্লক ও টেকনাফের উনচিপ্রাং ক্যাম্পের ১৬টি রোহিঙ্গা পরিবারকে তিনদিনের খাদ্যসহ মিয়ানমারে প্রেরণের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হইয়াছিল। কিন্তু গণহত্যার বিচার, নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও বসতভিটা ফেরতের নিশ্চয়তা ব্যতীত তাহারা মিয়ানমারে ফিরিয়া যাইবে না বলিয়া সাফ জানাইয়া দেয়। শুধু তাহাই নহে, এই সময় আন্তর্জাতিকভাবে একের পর এক চাপ আসিতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা স্থগিত রাখিবার আহ্বান জানায়। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কর্মকর্তারা প্রত্যাবাসন বন্ধ করিবার জন্য বাংলাদেশ সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলিয়া বিবৃতি দেয়। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ ও সংগঠন হইতে চাপ দেওয়া হইতে থাকে। এদিকে মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউ মাইয়ান্ত থু গত শুক্রবার বলিয়াছেন যে, রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের চুক্তি বাংলাদেশ সরকার মানিতে ব্যর্থ হইয়াছে। আবার প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়ায় উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হইয়াছে। অর্থাত্ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ঝুলিয়া যাওয়ায় বাংলাদেশ এক ত্রিশঙ্কু অবস্থার মধ্যে পড়িয়াছে।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ঝুলিয়া যাইবার পিছনে দায়ী মূলত পশ্চিমা দেশগুলির কৌশলগত চাপ, নিজ দেশে রোহিঙ্গাদের জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টিতে মিয়ানমারের আন্তরিকতার অভাব, একশ্রেণির আন্তর্জাতিক সংস্থার মদদ ও কিছু উচ্ছৃঙ্খল রোহিঙ্গাদের পরিকল্পিত হুমকি-ধামকি ইত্যাদি। তবে এই উদভূত পরিস্থিতির পরও বাংলাদেশ সরকার যে ধৈর্য, সহনশীলতা, উদারতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিতেছে তাহা প্রশংসনীয়। খোদ প্রধানমন্ত্রী বলিয়া দিয়াছেন, কাহাকে জোর করিয়া ফেরত পাঠানো হইবে না। আবার জোর করিয়া রাখাও হইবে না। বরং তাহাদের বোঝানো হইবে এবং যাহারা যাইতে সম্মত হইবে তাহাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শীঘ্রই আবারও শুরু হইবে। সমস্যা হইল, শরণার্থী ক্যাম্পগুলিতে একশ্রেণির এনজিও তাহাদের ভুল বোঝাইতেছে বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। সেইখানে এনজিওদের কার্যক্রমে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়া অনেকের মনে প্রশ্ন, রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদে এই দেশে রাখিয়া দেওয়ার চক্রান্তই কি সফল হইতে যাইতেছে? বাংলাদেশে বর্তমানে নূতন-পুরাতন মিলাইয়া ১৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী রহিয়াছে। কিন্তু একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা রোহিঙ্গাদের এই দেশে আশ্রয় পাওয়া নিয়া যতটা সরব ছিল, ফেরত পাঠানোর বিষয়ে তাহারা এখন ততটা সরব নহে।
যাহারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিরোধিতা করিতেছেন, তাহাদের আসল উদ্দেশ্য কী তাহা আমাদের বোধগম্য নহে। কিন্তু তাহারা এই শরণার্থীদের গ্রহণ করিতে প্রস্তুত—এমন কথাও আমরা শুনিতে পাই না। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফিরিবার পরিবেশ নাই বলিয়া যাহারা দাবি করিতেছেন, তাহারা মিয়ানমারকে সেই পরিবেশ সৃষ্টিতে কেন বাধ্য করিতেছেন না? ইতোমধ্যে গত শুক্রবার রাত্রে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে রোহিঙ্গা গণহত্যায় মিয়ানমারের নিন্দায় ওআইসি উত্থাপিত একটি প্রস্তাব গৃহীত হইয়াছে ১৪২-১০ ভোটে। কিন্তু কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় কেবল এই দায়সারা প্রস্তাব আমাদের কোনো উপকারে আসিতেছে না। বস্তুত রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের ব্যর্থতা সীমাহীন। এই বাস্তবতায় এই সমস্যার টেকসই সমাধান খুঁজিয়া বাহির করিতে আমাদের দুইটি আঞ্চলিক শক্তিশালী দেশের সাহায্য-সহযোগিতাকেই প্রাধান্য দেওয়া বাঞ্ছনীয়।