একটি জাতির উজ্জ্বল ভবিষ্যেক অনুজ্জ্বল করিয়া দেওয়া সম্ভব বৃহত্ একটি অপুষ্ট জনগোষ্ঠী তৈরি করিবার মাধ্যমে। বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় দেশ। অপুষ্টিজনিত সমস্যা আমাদের দেশে চিরাচরিত। স্বাধীনতার প্রায় চার যুগ পরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে চমকপ্রদ সাফল্যের ফসল ঘরে তুলিতে পারিলেও অপুষ্টিজনিত সমস্যায় এখনো আমরা তাত্পর্যপূর্ণ সাফল্য আনিতে পারি নাই। অপুষ্টি এমনই এক সমস্যা, যাহা দারিদ্র্যের মতো একটি দুষ্টচক্র তৈরি করে। অর্থাত্ ওই চক্র হইতে সহজে বাহির হইতে দেয় না। আর্থ-সামাজিক সীমাবদ্ধতার কারণে আমাদের দেশের বহু দরিদ্র মানুষ দৈনন্দিন পুষ্টির জন্য একমাত্র ভাতের উপর নির্ভরশীল। অন্যান্য খনিজ উপাদানের মতো জিঙ্কের পরিমাণও ভাতের ভিতরে অনেক কম থাকে। কিন্তু শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশে জিঙ্কের ভূমিকা অপরিসীম। গবেষকদের মতে, জিঙ্কের অভাবে শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয় দারুণভাবে। জিঙ্ক মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, হজম, পরিপাক ক্রিয়া বৃদ্ধি, ডায়াবেটিসসহ রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করিবার পাশাপাশি স্নায়ুচাপ কমায়। তাহা ছাড়া প্রদাহজনিত সমস্যা, একজিমা, হাড় ক্ষয়, সর্দি, চুল পড়ারোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে জিঙ্ক। বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি যেমন—ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, ম্যালেরিয়াতে আক্রান্ত হইবার ঝুঁকিও হ্রাস করে। অথচ আমাদের দেশের শতকরা ৪০ ভাগের বেশি মানুষ, বিশেষ করিয়া শিশু ও নারীদের জিঙ্কের ঘাটতি রহিয়াছে।
কিন্তু যদি ধানের এমন কোনো উন্নত জাত তৈরি করা সম্ভব হয়, যাহার ভিতরে জিঙ্কের পরিমাণ বেশি থাকিবে, তবে তাহা দেশের পুষ্টিঘাটতি লাঘবে বড় ধরনের ভূমিকা রাখিবে। প্রচলিত উচ্চ ফলনশীল ধানের জাতগুলিতে জিঙ্কের গড় পরিমাণ ১৫-১৬ মিলিগ্রাম। গবেষণায় দেখা গিয়াছে, ভাতে জিঙ্কের পরিমাণ যদি ইহার গড় মাত্রা হইতে মাত্র ৮ মিলিগ্রাম বাড়াইয়া ২৪ মিলিগ্রামে উন্নীত করা যায়, তবে আমাদের মতো দেশগুলির দরিদ্র মানুষের দৈনিক জিঙ্ক চাহিদার কমপক্ষে শতকরা ৪০ ভাগ পূরণ করা সম্ভব। এই বিষয়টি বিবেচনায় রাখিয়া বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা ১৬ বত্সর ধরিয়া নিরন্তর গবেষণা চালাইতেছেন জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের জাত উদ্ভাবনে। এইক্ষেত্রে ব্রি-ধান-৬২ জাতের মধ্যে প্রথম সাফল্য আসে, যাহার প্রতিকেজি চালে রহিয়াছে ১৯ মিলিগ্রাম জিঙ্ক। ভাতের মাধ্যমে জিঙ্কের অভাব দূর করিতে এখন অবধি ৮ জাতের জিঙ্কসমৃদ্ধ ধান উদ্ভাবন করিয়াছেন বিজ্ঞানীরা। সমপ্রতি বাংলাদেশ পরমাণু গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবন করিয়াছে বিনাধান ২০। জিঙ্কসমৃদ্ধ এই জাতের চালের রঙ লালচে ও বাদামি। প্রতিকেজি চালে ২৬ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম জিঙ্ক রহিয়াছে। এই জাতটির চাষাবাদ উচ্চ ফলনশীল ধানের আবাদের মতোই। ইহা সুখবর বটে। এককালে আয়োডিনের অভাবে শিশুদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিত। কিন্তু পরবর্তী সময়ে লবণে আয়োডিন মিশানো বাধ্যতামূলক করা হয়। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, সরকার যদি জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানচাষে কৃষকদের উত্সাহিত করে তাহা হইলে অপুষ্টিজনিত সমস্যায় ভালো ফল আসিবে। ইহা ছাড়া সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানের সময় যদি জিঙ্কসমৃদ্ধ ধান-চাল ক্রয় করা হয়, তাহা হইলে কৃষকদের মধ্যে এই ধান আবাদে আগ্রহ বাড়িবে। বিষয়টি ভাবিয়া দেখা যাইতে পারে।