পর্যটন হলো দ্রুত বিকাশমান শিল্প। আর বর্তমানে পর্যটন একটি বহুমাত্রিক ও শ্রমঘন শিল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণশীল ও বৃহত্ বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড হিসেবে এ শিল্প বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি লাভ করেছে। বিশ্বের কয়েকটি দেশ একমাত্র পর্যটনকে অবলম্বন করেই সমৃদ্ধির শিখরে আরোহণ করছে। বিশ্বায়নের পরিপ্রেক্ষিতে পণ্যের বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন সাধন করাই হলো পর্যটন শিল্পের মূল বিষয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ সম্ভাবনা আরো উজ্জ্বল। পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনাকে বাংলাদেশও কাজে লাগাতে পারে। বিশেজ্ঞদের মতে, আমাদের দেশে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঠিকমতো ও পরিকল্পিতভাবে করতে পারলে সুইজারল্যান্ড, পাতায়া, ব্যাংককের মতো ট্যুরিজম এখানেও গড়ে উঠতে পারে। বাংলদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতুলনীয়। বাংলাদেশের মতো ষড়ঋতুর প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য পৃথিবীর আর কোথাও নেই। আমাদের আছে নদ-নদী, সবুজ-শ্যামল মাঠ, ফসলের ক্ষেত, ছায়ায় ঢাকা গ্রাম, শান বাঁধানো পুকুর। গ্রাম-বাংলার মানুষের সরল জীবন বিশ্বের যেকোনো মানুষের হূদয় আকৃষ্ট করে। মনোরম পাহাড়, সর্ববৃহত্ সমুদ্র কক্সবাজার, বিশ্বখ্যাত ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন, সেন্টমার্টিন, টেকনাফ তো আছেই। আরো আছে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, ময়নামতি বিহার, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মনোমুগ্ধকর পাহাড়ের চা বাগান আর আদিবাসীদের বিচিত্র জীবনধারা। আছে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত, মাধবকুণ্ডের ঝর্ণাধারা, ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প, রেশম শিল্প, খাদি শিল্প, জামদানি, টাঙ্গাইলের তাঁত, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমবাগান, বাংলার বিচিত্র পেশা, ঐতিহ্যবাহী সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, স্বাধীনতা ও ভাষা আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস-ভাস্কর্য ও স্থাপনা।
বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার প্রতিটিই স্বরূপে অপরূপ আকর্ষণীয়। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসভূমি সুন্দরবন; সিলেটের দীর্ঘতম চা বাগান; পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাই হ্রদ; জাফলং; নওগা, নাটোর, দিনাজপুর, কুমিল্লা, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ময়মনসিং, শেরপুরের প্রত্নসম্পদ।
আমরা নানা সময় নিজের দেশকে অপরূপ হিসেবে উপস্থাপন করি, বিশেষত আবেগের জায়গা থেকে প্রায়ই বলে থাকি- এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি! কিন্তু দেশটিকে দেখার ক্ষেত্রে আমাদের একটা জন্মগত অবহেলা কাজ করে সবসময়। উচ্চবিত্তরা দেশের ভিতরে বেড়াতে ভালোবাসে না- ছুটিছাটা পেলে চলে যায় বিদেশে কোনো পর্যটন স্পটে। নিম্নবিত্তদের সামর্থ্য কম; ঈদ কিংবা পূজায় তারা বড়জোর নিজ এলাকার মেলা বা শিশুপার্ক জাতীয় স্থানে বেড়াতে যায়। একমাত্র মধ্যবিত্তরাই নিজ গণ্ডির বাইরে অন্য এলাকায় যেতে পছন্দ করে এবং তাদের সে সামর্থ্যও আছে। তাছাড়া দেশের নানা জায়গায় ছোট-বড় অনেক পর্যটন স্পট থাকলেও অনেকেই সেগুলোর খবর জানতো না। মিডিয়ার কল্যাণে এখন সেগুলো উঠে আসছে। পর্যটন স্পট নির্বাচন করার ক্ষেত্রেও প্রচলিত চিন্তাচেতনা থেকে মানুষ একটু একটু করে বেরিয়ে আসছে। আগে কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ইত্যাদি নামকরা জায়গার প্রতি মানুষের আগ্রহ ছিল। কিন্তু অনেকেই এখন স্বল্পপরিচিত বা অপরিচিত সুন্দর কোনো জায়গা, নদীর ধারে কাশফুলের মাঠ কিংবা স্রেফ গ্রাম দেখতে বেরিয়ে পড়ে। এ ধরনের পর্যটক কম হলেও দিন দিন এদের সংখ্যা বাড়ছে। ঢাকা শহরের মানুষ আজকাল মাওয়া ফেরিঘাটও দেখতে যায়, একদিনের ছুটি পেলে চলে যায় মানিকগঞ্জের পুরনো মসজিদ বা মন্দির দেখতে কিংবা ঘুরে আসে বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে।
বাংলাদেশে পর্যটন শিল্প বিকাশের দারুণ সুযোগ রয়েছে। বিদেশিরা আসুক বা না আসুক, অভ্যন্তরীণ পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটাতে পারলেই এ শিল্পটি নিজ ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে যাবে। ১৫ কোটির বেশি মানুষের অন্তর ১০ ভাগও যদি প্রতিবছর দেশের কোথাও না কোথাও বেড়াতে যায়, তাহলে এর অর্থনৈতিক প্রভাব কতটা বিশাল হবে সেই হিসেব অর্থনীতিবিদরা সহজেই বের করতে পারবেন।
আগেকার সময়ের পর্যটনের সঙ্গে এখনকার পর্যটনের ধারণার অনেক পার্থক্য রয়েছে। পরিবর্তিত সময় ও গতিশীল জীবনই হয়তো এর কারণ। আগে পর্যটকেরা একটা জায়গায় শুধু মুগ্ধ হওয়ার জন্য ভ্রমণ করতেন না, সেই এলাকার মানুষের জীবন, সংস্কৃতি কিংবা পরিবেশ অধ্যয়ন ও পর্যবেক্ষণ ্ছিল তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। এ সময়ের পর্যটকেরা কি সেদিকে নজর দেন? আজকাল বেড়াতে বের হওয়া মানে মুগ্ধ হতে যাওয়া। যে সুন্দরবনে বেড়াতে গিয়ে এর সৌন্দর্য দেখে আমরা মুগ্ধ হই, লঞ্চের পাশ দিয়ে বেয়ে চলা সুন্দরবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ জেলে-নৌকা দেখে তাদের অবস্থার কথা আমরা কয়জন ভাবি? আমরা কয়জন কোনো এলাকা থেকে ঘুরে এসে সেগুলো লিখে রাখি বা প্রকাশ করি? এখানে অবশ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বিখ্যাত ব্যক্তি ছাড়া প্রিন্ট মিডিয়াগুলো সাধারণ মানুষের ভ্রমণকাহিনী খুব কমই ছাপে বা ছাপেই না। অথচ মানুষের এ ধরনের লেখা বা অনুভূতি অন্যদের উদ্বুদ্ধ করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
n লেখক: শিক্ষার্থী, নটর ডেম কলেজ ঢাকা