টোকিও অলিম্পিক কোনো বিকিনি শোকেস নয়

নারী ক্রীড়াবিদদের ইউনিটার্ড (স্ট্রেচেবল ফ্যাব্রিকের টাইট-ফিটিং পোশাক, যা গলা থেকে হাঁটু বা পা পর্যন্ত শরীরকে ঢেকে রাখে) ও হিজাব পরতে দেওয়া হোক। একজন আমেরিকান অশ্বেতাঙ্গ মুসলিম নারী হিসেবে আমি অবাক হয়েছি :কেন আমরা সাদা নারীদের কভার করার অধিকারকে সমর্থন করি অথচ কৃষ্ণাঙ্গ বা বাদামি বর্ণের নারীদের ব্যাপারে একই দৃষ্টিভঙ্গি লালন করি না?

অলিম্পিক খেলাধুলার বিষয়, তাহলে নারী অ্যাথলেটরা কী পরছেন তা নিয়ে কেন আমরা কথা বলছি? সম্প্রতি টোকিও অলিম্পিকে নিজেদের পোশাকে বড় পরিবর্তন এনেছে জার্মান নারী জিমন্যাস্ট দল। ‘যৌন আবেদনময়’, চিরায়ত পোশাকের বদলে তারা পরেছেন অন্য রকম ডিজাইনের পোশাক। জিমন্যাস্টসরা যেমন বিকিনির মতো

পোশাক পরেন, সেটির বদলে তাদের গায়ে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ঢাকা পোশাক। এই ঘটনার আগের দিন একটি তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপে নরওয়ের নারীদের বিচ হ্যান্ডবল দল স্পোর্টস বিকিনি বটমের পরিবর্তে শর্টস পরে বুলগেরিয়ার মাঠে নেমেছিলেন। আর সেই কারণেই মোটা অঙ্কের জরিমানা করা হয় তাদের। আর তার পরের দিন টোকিও অলিম্পিকে নিজেদের পোশাকে বড় পরিবর্তন আনে জার্মান নারী জিমন্যাস্ট দল। জার্মান জিমন্যাস্টিকস ফেডারেশন চায় না, নারী দলের খেলার পোশাকে কোনো ধরনের ‘যৌন আবেদনময়তা’ থাকুক।

টোকিওর জার্মান দল, যার মধ্যে অলিম্পিক অভিজ্ঞ এলিজাবেথ সেয়েজ, কিম বুয় ও পাউলিন শ্যাফার-বেটজ এবং প্রথম টাইমার সারা ভস অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন, ২৫ জুলাইয়ের প্রাথমিক রাউন্ডের খেলায় পায়ের ও হাতের লম্বা ইউনিটার্ড পোশাক পরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। উল্লেখ করা যেতে পারে, অলিম্পিক ফাইনালে প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে যে দলগুলো এগিয়ে আছে তার মধ্যে জার্মান নারী জিমন্যাস্ট দল অন্যতম।

হিজাবসহ খেলায় অংশ নেওয়ার অধিকার

এলিজাবেথ সেয়েজ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা দেখাতে চেয়েছিলাম যে প্রত্যেক নারীর, প্রত্যেক মানুষেরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত যে সে কী পরবে।’ সেয়েজ সাংবাদিককে আরো বলেন, ‘এর অর্থ এই নয়, আমরা স্বাভাবিক লিওটার্ড(আটোসাটো, কিন্তু গোটা শরীরের পোষাক)আর পরতে চাই না। খেলাটিকে কীভাবে আমরা অনুভব করছি এবং আমরা আসলে কী পরতে চাই—তার ভিত্তিতেই পোশাক পরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এবং আমাদের ইচ্ছা অনুযায়ী সেই সিদ্ধান্ত প্রতিটি দিন আলাদা হতে পারে। প্রতিযোগিতার দিনও আমরা কী পরব সেই সিদ্ধান্ত আমরাই নেব।’

সেয়েজ তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টেও এ ব্যাপারে কথা চালিয়ে গেছেন। সেখানে লিখেছেন, যদি কোনো অ্যাথলেট স্বাভাবিক অ্যাথলেট পোশাকে অস্বস্তি বা যৌনতার গন্ধ খুঁজে পান, আমাদের নতুন সুটগুলির মাধ্যমে তাদের জন্য নিজস্ব ইচ্ছা-অনিচ্ছার দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করা হয়েছে।

এটি উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ যে, এমন কিছু নারী খেলোয়াড় রয়েছেন, যারা তাদের অলিম্পিক ইউনিফর্ম নিয়েই খুশি আছেন, তারা নিজেকে যেভাবে প্রকাশ করতে চান তেমনভাবেই নিজেকে প্রকাশ করেন। উদাহরণস্বরূপ ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকের একটি ঘটনা বলা যায়। সেখানে সৈকত ভলিবলের নারী খেলোয়াড়দের কাছে শর্টস ও স্লিভড টপস পরার বিকল্প ছিল, কিন্তু বেশির ভাগ নারী খেলোয়াড়ই বিকিনি বটম পরে খেলতে পছন্দ করেছিলেন।

বিশ্বব্যাপী যেসব নারী অলিম্পিক ক্রীড়াবিদরা যৌনোত্তেজক এবং খেলাধুলায় দুষ্ট ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, তাদের চারপাশের মানুষকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে জাগিয়ে তুলেছেন, একজন নারীবাদী হিসেবে এটা আমার ভেতরে ক্ষমতা ও শক্তির সঞ্চার করে।

তবে আমেরিকান একজন অশ্বেতাঙ্গ মুসলিম নারী হিসেবে, আমি এই প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা না করে পারি না—আমরা সাদা নারীদের অধিকারের জন্য যতটা দৃঢ়তার সঙ্গে সমর্থন করি, কৃষ্ণাঙ্গ বা বাদামি নারীদের অধিকারের জন্য ততটা সমর্থন করি না কেন?

পুরস্কারপ্রাপ্ত ক্রীড়া সাংবাদিক শিরীন আহমেদ লিখেছেন, ‘হিজাব নিষেধাজ্ঞাগুলি মুসলিম নারী অ্যাথলেটদের প্রজন্মকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ঐতিহাসিকভাবে, খেলোয়াড় এবং প্রতিপক্ষের ‘সুরক্ষা’ নিশ্চিত করতে হিজাব নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়েছিল। আমরা জানি যে এটি সত্য নয়।’

আসলে এসব রোষের স্তর পালটে যায় মানুষের শরীরের রঙের ওপর। মিজ আহমেদ বলেছেন যে, মুসলিম ও বর্ণবাদের শিকার নারীদের ক্ষেত্রে বাধাদান এবং জোর করে হিজাব বা পর্দা তুলে দেওয়ার বাস্তবতা দীর্ঘকাল ধরে আমরা দেখে আসছি। তিনি আরো উল্লেখ করেন, ২০১২ সালে ফ্রান্স কীভাবে নারীদের বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল, ফরাসি মুসলিম নারীরা যারা হিজাব পরেছিলেন তাদের কোনোভাবেই খেলতে দেওয়া হয়নি। এমনকি কোচিং করতে, প্রশিক্ষণ দেওয়া বা কোনো দলের হয়ে অংশগ্রহণের ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। মিজ আহমেদ আরো বলেন, ‘এটা সত্যিই মারাত্মক যে, খেলাধুলার একটি বৃহত্তর অংশে যৌনতাও একটি অংশ হয়ে উঠেছে।’

অলিম্পিক গেমসে সাদা নারীদের দেহের অবয়ব মুসলিম নারীদের চেয়ে আলাদা নয়, কিন্তু এটা স্পষ্ট যে, নারী অ্যাথলেটদের ত্বকের রঙের ওপর নির্ভর করে আমাদের রোষের ব্যারোমিটার। এটি একটি বড় সমস্যা। টোকিও অলিম্পিকের আন্তর্জাতিক মঞ্চে রিয়েল টাইমে খেলতে গেলে, আসুন আমরা সকলে মিলে এই কতর্ব্যনিষ্ঠ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি যে, নারীরাও যে কোনো জায়গায় যে কোনো পোশাক পরার অধিকার রাখবে।

n লেখক : যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশি সাংবাদিক, নারী অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ,

তার বই ‘The Pain Gap: How Sexism and Racism in Healthcare Kill Women’ আগামী অক্টোবরে প্রকাশিত হবে।