এক অশুভ শক্তি কিশোর গ্যাং

নগর জনপদে এক মহা আতঙ্কের নাম কিশোর গ্যাং। খুনখারাবি, ছিনতাই, ধর্ষণ, নেশায় মত্ত থাকা, চুলে উদ্ভট কাটিং, কানে-গলায় অলংকারে শোভিত, শার্টের বোতাম খোলা রেখে হোন্ডার মহড়া দেওয়া, শহরের অলিগলিতে মাস্তানি করা, শহরের শান্ত পরিবেশকে অশান্ত করা এদের বৈশিষ্ট্য। এরা বয়সে কিশোর।

কিশোর বয়স ধরা হয় ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সকে। এই বয়সে বখে যাওয়া সন্তানগুলো বিভিন্ন গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত হয়ে অপরাধ জগতে নাম লেখায়। পরিবার ও সমাজের দায়িত্বে অবহেলার কারণে তাদের বিস্তার ঘটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাজে নানা অসংগতি রয়েছে। নিজেদের সভ্যতা, কৃষ্টি, কালচার থেকে দিনদিন সরে যাচ্ছে কিশোরেরা। এই বয়সে তাদের আচার-আচরণে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। নিজেকে স্মার্ট ভাবতে শেখে। মনের মাঝে প্রেমিক প্রেমিক ভাবনার সৃষ্টি হয়। অযথা ব্যয় করার মানসিকতা সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক ব্যক্তিরা স্বার্থসিদ্ধির জন্য হাত বাড়ান। তখনই গ্রুপ কালচারের সৃষ্টি হয় কিশোর গ্যাং নামে। তা ছাড়া ভিনদেশি কালচার তাদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পারস্পরিক নানা কারণে অনেক আগে থেকে এই অল্পবয়সি কিশোরেরা অপরাধজগতে নাম লিখেয়েছে। এরা মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার কাজেও জড়িত হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আইনশৃঙ্খলার দুর্বল কাঠামোর কারণে এদের বিস্তার বেড়েই চলেছে। বাবা-মা সাংসারিক বা পেশাগত কারণে ব্যস্ত। সন্তানের আদর্শ চরিত্র গঠনে তারা অনেকটাই অমনোযোগী। মাদক ব্যবসায়ীরা সামান্য মুনাফার আশায় এদের হাতে মাদক তুলে দিচ্ছে। মাদকের বেড়াজালে আটকা পড়ে কিশোর গ্যাং আরো সক্রিয় হচ্ছে। তখন অপরাধজগতে বিস্তার লাভ করতে থাকে। ডিএমপির ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ৪০টির মতো কিশোর গ্যাং রয়েছে। প্রতিটি গ্রুপে ১৫-২০ জন করে আছে। গত এক বছরে এদের দ্বারা সাতটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

রাজধানীতে প্রতি মাসে গড়ে ২০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এসব বেশির ভাগ ঘটনায় কিশোর অপরাধীরা জড়িত বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। আবার ২০১৮ সাল থেকে গত জানুয়ারি ২০২১ পর্যন্ত রাজধানীতে হওয়া ৩৬৩টি ছিনতাইয়ের নেপথ্যেও ছিল কিশোর অপরাধীরা। ঢাকার শিশু আদালতের নথি অনুযায়ী গত ১৫ বছরে রাজধানীতে কিশোর-তরুণদের সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে ৮৬টি খুনেরা ঘটনা ঘটেছে। আর পুলিশের তথ্যমতে, গত ১৭ বছরে কিশোর অপরাধীদের হাতে ১২০ জন খুন হয়েছে। এই গ্রুপগুলোর মধ্যে উত্তরার কিশোর গ্যাং সবচেয়ে আলোচিত। ঢাকার বাইরের এলাকা থেকেও খুনখারাবির খবর প্রায় সময় পাওয়া যায়।

অন্যদিকে বরগুনার নয়ন বন্ড তার ০০৭ গ্রুপ নিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করে। এ হত্যার জন্য ১১ জন কিশোরকে কারাদণ্ড দিয়ে বরগুনার আদালত বলেছে, ‘সারা দেশে কিশোর অপরাধ বেড়েছে, গডফাদাররা এই কিশোরদের ব্যবহার করছে।’ গত বছরের ৯ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় দুই কিশোর গ্যাংয়ের বিরোধে নাইম নামে এক কিশোরকে ছুরিকাঘাতে খুন করা হয়। একই এলাকায় শরীফ হোসেন নামে একজনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। উল্লেখিত ঘটনাপ্রবাহে বুঝতে বাকি নেই, কিশোর গ্যাং দিনদিন বেপরোয়া হচ্ছে। কিশোর বয়সিরা জনসংখ্যার দিক দিয়ে বিশাল অংশ, এদের সংশোধন করতে না পারলে আগামী প্রজন্মের জন্য তারা হবে হুমকিস্বরূপ।

তাদের ভালো রাখার ক্ষেত্রগুলো কি ভালো আছে? এসব কারো ভেবে দেখার যেন সময় নেই। ঢাকার দুই সিটির ২৩৫টি মাঠ ছিল, এগুলোর মধ্যে ৪২টি মাঠ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। প্রতিষ্ঠানের দখলে আছে ১৪১টি, বিভিন্ন কলোনির দখলে আছে ২৪টি, যা কলোনির জন্য সংরক্ষিত। ঈদগাহ মাঠ আছে ১২টি, সেটাও উন্মুক্ত। ১৬টি দখল করে আছে কোনো কোনো সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক বা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান। একসময় পাঠদান করার জন্য ২৩টি পাঠাগার ছিল। এখন কোনো রকমে টিকে আছে সাতটি, তাও নিয়মিত খোলা হয় না। তাহলে খেলাধুলা ও পাঠ্যাভ্যাস গড়ে উঠবে কীভাবে? শিশু-কিশোরদের অবসর কাটানোর জায়গাগুলো সংকুচিত হওয়ার কারণেও এমনটি হচ্ছে।

আমরা বিশ্বাস করি, কিশোর অপরাধ কমিয়ে নির্মূল করা সম্ভব। কিশোর গ্যাং থেকে ফিরিয়ে এনে কিশোরদের শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি আমাদের সদিচ্ছারও প্রয়োজন আছে। ঘর থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ—সব জায়গায় কিশোরদের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে কর্মপরিকল্পনা সাজাতে হবে। খেলাধুলা থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক, চিত্রাঙ্কন, শারীরিক শিক্ষাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের ওপর ব্যস্ত রাখতে হবে। এক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা নয়, তারা কতটা সৃজনশীলভাবে শিখতে পেরেছে তা দেখতে হবে।

শিশু-কিশোরদের মোবাইল হাতে না দিয়ে বই পড়ায় উত্সাহিত করে তুলতে হবে। তাদের নিয়ে মঞ্চ নাটক, পথনাটকসহ সব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে। শিশুকাল থেকে যদি তাদের মধ্যে নারীর প্রতি প্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলা যায় এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়ানো যায়, তাহলে কিশোরেরা ভালো থাকবেই। কিশোরেরা ভালো থাকলে আগামী প্রজন্ম নিয়ে আর ভাবতে হবে না। তখন কিশোর অপরাধও কমে যাবে।

n লেখক :ব্যাংকার