ক্যানসার চিকিত্সাসেবার নাজুক অবস্থা

সোমবার ছিল বিশ্ব ক্যানসার দিবস। বরাবরের ন্যায় এইবারের ক্যানসার দিবসেও অনুভূত হইয়াছে যে, বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিত্সা পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নহে। একটি হিসাব অনুযায়ী দেশে প্রতিবছর দেড় লক্ষ মানুষ নূতন করিয়া ক্যানসারে আক্রান্ত হইতেছে। অন্য এক হিসাব অনুযায়ী ২০১৬ সালে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ ক্যানসারে মৃত্যুবরণ করিয়াছে। একদিকে ইহা এক ভয়ঙ্কর ব্যাধি, অন্যদিকে চিকিত্সাসেবা অপ্রতুল, উপরন্তু এই ব্যাধির চিকিত্সা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ফলে, অধিক জনসংখ্যার এই দেশে ক্যানসার চিকিত্সা পরিস্থিতি বেশ নাজুকই বলিতে হইবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে ১৭০টি ক্যানসার চিকিত্সা কেন্দ্র প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিত্সা কেন্দ্র রহিয়াছে মাত্র ২৬টি। ইহার মধ্যে সরকারি ১৬টি এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন ও এনজিও পরিচালিত ১০টি। যাহাও-বা রহিয়াছে তাহাও হূদরোগ বা অন্য কোনো রোগের চিকিত্সার ন্যায় রোগীদের আস্থা অর্জন করিতে পারে নাই। অন্যদিকে সরকারি কেন্দ্রগুলিতে চিকিত্সাব্যয় অপেক্ষাকৃত কম হইলেও বেসরকারি কেন্দ্রগুলিতে ব্যয় অনেক বেশি। উচ্চবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত পরিবারসমূহ তাহাদের সামর্থ্য অনুযায়ী ভারত, ব্যাংকক কিংবা সিঙ্গাপুরে ক্যানসারের চিকিত্সা লইয়া থাকে। আর যাহাদের সামর্থ্য নাই, তাহারা দেশেই চিকিত্সা করাইয়া থাকেন। কিন্তু ন্যূনতম চিকিত্সাব্যয়ই সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল হইয়া থাকে। তাই অর্থের অভাবে হয় মানুষ চিকিত্সা লইতে পারে না, অথবা মধ্যপথে চিকিত্সা বন্ধ করিয়া দিতে বাধ্য হয়। 

দেশের ক্যানসার চিকিত্সার সর্ববৃহত্ প্রতিষ্ঠান হইল মহাখালীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। আধুনিক যন্ত্রপাতিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি ক্যানসার চিকিত্সার সকল ধরনের সেবা কেবল এই হাসপাতালেই পাওয়া যায়। আবার চিকিত্সাব্যয়ও এই হাসপাতালে অপেক্ষাকৃত কম। তাই এই হাসপাতালে রোগীদের প্রচণ্ড ভীড়। তিনশত শয্যার এই হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন ১২ শত রোগীর চিকিত্সা দেওয়া হইয়া থাকে। কিন্তু বছরজুড়িয়া রোগীদের প্রচণ্ড চাপের কারণে এইখানে মানসম্মত চিকিত্সা দেওয়া সম্ভব হইতেছে না। উপরন্তু সারা দেশ হইতে আক্রান্ত  রোগী ও তাহাদের পরিবারের সদস্যগণ এইখানে আসিতে বাধ্য হইতেছেন এবং অচেনা রাজধানীতে তাহারা অনিঃশেষ ভোগান্তির শিকার হইতেছেন। তাই প্রয়োজন উন্নত যন্ত্রপাতিসহ সকল চিকিত্সাসুবিধাসংবলিত এইরূপ অধিকসংখ্যক হাসপাতালের। নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ প্রতিটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ক্যানসার ইউনিট খুলিবার ও প্রতিটি বিভাগীয় শহরে একটি করিয়া ১০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ চিকিত্সা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার প্রতিশ্রুতি দিয়াছে। আওয়ামী লীগ সরকার পুনর্বার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হইয়াছে, তাই দেশে ক্যানসার চিকিত্সাসুবিধা বৃদ্ধি পাইবে ইহা আমরা প্রত্যাশা করিতে পারি। কেবল রাজধানীর একটি কেন্দ্র নহে, দেশের সর্বত্র এই মারণব্যাধির চিকিত্সার ব্যবস্থা থাকিতে হইবে। যাহাদের সামর্থ্য আছে, তাহারা বিদেশে যাইতে থাকিবেন, কিন্তু যাহাদের সামর্থ্য নাই, তাহারা যেন স্বল্পমূল্যে দেশেই চিকিত্সার সুযোগ পান, সেই ব্যবস্থা করিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে, স্বাস্থ্যসেবা একটি সরকারের সেবার অগ্রাধিকারের তালিকায় প্রথমদিকেই থাকা      আবশ্যক। উন্নত ক্যানসার চিকিত্সাসেবা এইক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হিসাবে বিবেচিত হইবার দাবি রাখে।