দৈনিক আজাদ, ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮

পাক-গণপরিষদে বাংলাকে পরিষদের ভাষা করার দাবি

করাচি, ২৫ ফেব্রুয়ারি, অদ্য পাকিস্তান গণ-পরিষদে প্রবল বিতর্কের পর ইংরেজি ও উর্দু ভাষার সহিত বাংলা ভাষাকেও পরিষদের সরকারি ভাষা করিবার প্রস্তাব অগ্রাহ্য হয়। শ্রীযুক্ত ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত খসড়া নিয়ন্ত্রণ প্রণালির ২৯ নং ধারা সম্পর্কে এক সংশোধন প্রস্তাব আনয়ন করিলে এই বিতর্কের উত্পত্তি হয়। ২৯ ধারা অনুযায়ী পরিষদে প্রত্যেক সদস্যকে উর্দু বা ইংরেজি ভাষায় বক্তৃতা করিতে হইবে। শ্রীযুক্ত দত্ত প্রস্তাব উত্থাপন করিয়া বলেন যে, প্রাদেশিকতা মনোভাব লইয়া তিনি এই প্রস্তাব করেন নাই। পাকিস্তানের ছয় কোটি ৯০ লক্ষ অধিবাসীর মধ্যে বাংলা ভাষা ভাষীর সংখ্যা হইতেছে চার কোটি ৪০ লক্ষ। এই কারণেই তিনি এই প্রস্তাব আনয়ন করিয়াছেন। তিনি আরও বলেন যে, সংখ্যাধিক্যের কথিত ভাষাই রাষ্ট্রের ভাষা হওয়া উচিত। সুতরাং, বাংলা ভাষা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত।

সংশোধন প্রস্তাবের বিরোধিতা করিয়া পরিষদের নেতা জনাব লিয়াকত আলী খান বলেন, “...পাকিস্তান একটি মুসলিম রাষ্ট্র। সুতরাং পাকিস্তানের ভাষা মুসলিম রাষ্ট্রের ভাষাই হওয়া উচিত। প্রথমে সংশোধন প্রস্তাবের উদ্দেশ্য নির্দোষ বলিয়া আমি ভাবিয়াছিলাম। ...কিন্তু বর্তমানে মনে হয় পাকিস্তানের অধিবাসীদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করা এবং একটি সাধারণ ভাষার দ্বারা ঐক্যসূত্র স্থাপনের প্রচেষ্টা হইতে মুসলমাদের বিচ্ছিন্ন করাই এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য।...”

পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন বলেন:“উর্দুই একমাত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হইতে পারে বলিয়া পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ লোকের অভিমত। বাংলাকে সরকারি ভাষা করিবার কোনোই যুক্তি নাই।...” পরিষদে কংগ্রেসী দলের অস্থায়ী নেতা শ্রীযুক্ত শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শ্রীযুক্ত দত্তের সংশোধন প্রস্তাব সমর্থন করিয়া বলেন, “...এতদিন পর্যন্ত আমার ধারণা ছিল যে, পাকিস্তান জনগণের রাষ্ট্র এবং সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু উভয় সম্প্রদায়ের। কিন্তু পরিষদের নেতার বিবৃতি সম্পর্কে অমুসলমানদের বিশেষভাবে বিবেচনা করিতে হইবে। শাসনতন্ত্র গঠনে অমুসলমানদের কোনো অধিকার আছে কিনা এই কথা বর্তমানে তাহাদিগকে বিবেচনা করিতে হইবে।...”

জনাব তমিজুদ্দীন খাঁ বিতর্কের উত্তর প্রদান করিতে উঠিয়া বলেন, “...পরিষদের কংগ্রেসী দলের নেতার বিবৃতির একটা বিষয় অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলিয়াছেন যে, পাকিস্তান মুসলিম রাষ্ট্র বলিয়া পরিষদের নেতা বলিয়াছেন, সুতরাং সংখ্যালঘুরা তাহাদের ভবিষ্যত্ সম্পর্কে আশঙ্কাচিত্ত হইবে। এই পরিষদে প্রথম বক্তৃতায় এবং পরে বহু জনসভায় পরিষদের সভাপতি সুস্পষ্টরূপে ঘোষণা করিয়াছেন যে, সংখ্যাগুরুদের সমান অধিকারই সংখ্যালঘুরা ভোগ করিবে।...” জনাব তমিজুদ্দীন খাঁ বলেন যে, তিনি উক্ত প্রস্তাব গ্রহণ করিতে পারেন না। পরে প্রস্তাবটি ভোটে দেওয়া হইলে অগ্রাহ্য হয়।

সংগ্রহ ও গ্রন্থনা :দীপংকর চন্দ