বাণিজ্যযুদ্ধের সুবিধা পেতে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে হবে

গত মার্চ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে শুরু হওয়া বাণিজ্য যুদ্ধে মূল দুই দেশের বাইরেও এশিয়ার কিছু দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এর মধ্যেও কিছু দেশ স্বল্প মেয়াদে সুবিধা পেতে পারে। চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি কমলে বাংলাদেশ এ সুবিধা পেতে পারে। অন্যদিকে এর প্রতিক্রিয়ায় চীনের কিছু বিনিয়োগ এশিয়ার অন্যান্য দেশে স্থানান্তর হতে পারে। এই সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশেরও। কিন্তু এসব সুবিধা ধরার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা মনে করেন, বাংলাদেশ নিজের অবস্থান তৈরি করতে না পারলে এসব সুবিধা আমাদের অন্যতম প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনামসহ অন্যান্য দেশে চলে যাবে। এ যুদ্ধের ফলে চীন থেকে স্থানান্তর হওয়া বিনিয়োগ ধরতে অন্তত চারটি পরামর্শ দিয়েছেন তারা। এগুলো হলো ব্যবসা সহজ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ বিশেষত গার্মেন্টস পণ্যের বাইরে ইলেকট্রনিক্স ও উচ্চ প্রযুক্তিতে মনোযোগী হওয়া, উত্পাদনশীলতা বাড়ানো ও উত্পাদন ব্যয়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা তৈরি করা।

গতকাল শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক সেমিনারে তারা এসব কথা বলেন। ‘বাণিজ্য যুদ্ধ ও বাংলাদেশে এর প্রভাব’ শীর্ষক ওই সেমিনার যৌথভাবে আয়োজন করে ডিসিসিআই ও বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই)। ডিসিসিআই সভাপতি আবুল কাশেম খানের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব শুভাশীষ বসু।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে বিএফটিআই’র প্রধান নির্বাহী (সিইও) আলী আহমেদ বলেন, বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে চীন থেকে বেশকিছু শিল্প স্থানান্তর হবে। ফলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য বিনিয়োগকারীদের প্রণোদনা দিতে হবে। বিনিয়োগ সুবিধাগুলো ব্র্র্যান্ডিং (প্রচার) করা, অবকাঠামো উন্নয়ন তথা ব্যবসা করার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। 

পোশাক খাতে অতি মনোযোগী হওয়ায় অন্য খাতের সম্ভাবনা ধরতে পারছে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। ট্যারিফ কমিশনের সদস্য ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ মোস্তফা আবিদ খান বলেন, ইলেকট্রনিক্স ও প্রযুক্তি পণ্যের ব্যবসা স্থানান্তর হলে তা যাবে ভিয়েতনামে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশ এই সুবিধা ধরতে পারছে না। পোশাকের রুল্স অব অরিজিন (পণ্যের কাঁচামালের উত্স দেশ) ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর হলে চীনের তুলা ক্রয় করার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হবে। সেক্ষেত্রে চীনের পণ্য বলে বাড়তি শুল্ক আরোপ করতে পারে। মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ সুবিধা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

ডিসিসিআইয়ের সভাপতি বাংলাদেশের রপ্তানি ও চীনের বিনিয়োগ আনার ক্ষেত্রে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) বড় বিকল্প হতে পারে বলে উল্লেখ করেন। এ জন্য ব্যবসা সহজ করার পাশাপাশি গবেষণা ও উন্নয়নে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান।

গত মার্চে চীনের বেশকিছু পণ্যের ওপর বাড়তি ট্যারিফ আরোপের মধ্য দিয়ে বাণিজ্য যুদ্ধের শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। এর পর চীন যুক্তরাষ্ট্রের ৩শ’ কোটি ডলারের আমদানি পণ্যের ওপর একই হারে শুল্ক আরোপ করে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ৫ হাজার কোটি ডলারের চীনা পণ্যে নতুন করে শুল্ক আরোপের পর সমপরিমাণ মূল্যের পণ্যের ওপর চীনও শুল্ক আরোপ করে। ফলে কমতে থাকে উভয় দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বরে চীনের আরও ২৬ হাজার ৭শ’ কোটি ডলারের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে রেখেছে ট্রাম্প প্রশাসন।

শুধু চীনের সঙ্গে নয়, ইউরোপ, কানাডা ও মেক্সিকোর সঙ্গেও একইভাবে ট্যারিফ আরোপের পথে হেঁটেছে যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় এসেছে, এর ফলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমতে পারে। ফলে বিশ্ব নতুন মন্দার দিকেও হাঁটতে পারে। অবশ্য বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, তুরস্ক, কম্বোডিয়ার মতো দেশ এ যুদ্ধের ফলে স্বল্প মেয়াদে কিছু সুবিধা পেতে পারে বলেও গবেষণায় এসেছে।

বাণিজ্যযুদ্ধের ফলে চীনের স্থানান্তর হওয়া বিনিয়োগ বাংলাদেশে আসার ক্ষেত্রে সক্ষমতা যথেষ্ট নয় বলে স্বীকার করেছেন বাণিজ্য সচিব। এ জন্য উত্পাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

এ সময় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো’র (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান বিজয় ভট্টাচার্য, আইএফসি’র প্রকল্প ব্যবস্থাপক মাশরুর রিয়াজ, এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশনের প্রধান নির্বাহী হুমায়ুন রশিদ, ডিসিসিআই’র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট কামরুল ইসলাম প্রমুখ।