জঙ্গিরা মৃত দেহগুলিকে অস্ত্র দিয়ে কোপাচ্ছিল

রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় বিভীষিকাময় রাতের বর্ণনা দিলেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির প্রাক্তন শিক্ষক হাসনাত রেজা করিমের স্ত্রী শারমিনা পারভীন। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি বলেন, জঙ্গিরা বেকারির ভেতরে আমাদের আশে-পাশে পড়ে থাকা মৃত দেহগুলো (ডেড বডি) ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপায়। রমজান মাস, যখন সেহরির সময় হয়, তখন তারা আমাদের সেহরির ব্যবস্থা করে। পরিস্থিতি খাবার উপযোগী ছিল না। তারা বারবার আমাদের জিজ্ঞাসা করে, খাচ্ছি না কেন? তারা ধমক দেয় তাই এক কামড় খাবার খেয়েছিলাম। এরপর রাতে আমাদের অস্ত্রের মুখে বসিয়ে রাখে। গতকাল বুধবার ঢাকার সন্ত্রাস বিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে এ সাক্ষ্য দেন। বিচারক মো. মজিবুর রহমান সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিচার কার্যক্রম মুলতবি করেন।

সাক্ষ্যে শারমিনা পারভীন বলেন, ভোরের দিকে আমার স্বামী ও তাহমিদ নামে আরেকটি ছেলেকে তারা ছাদে নিয়ে যায়। এর কিছু সময় পর আবার তাদের একই টেবিলে নিয়ে এসে বসায়। আমার স্বামীকে চাবি দিয়ে বাইরের গেটের তালা খুলে আসতে বলে। তালা খুলে আসার পর বলে আপনারা এক এক জন করে বের হয়ে যান। বের হয়ে আসার আগে মোবাইলসহ যা যা নিয়েছিল তা ফেরত দেয়। বাইরে বের হওয়ার পরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আমাদের নিরাপদ হেফাজতে নিয়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী আমাদের ডিবি অফিসে নিয়ে যায়। পরে জিজ্ঞাসাবাদের পর আমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, ২০১৬ সালের ১ জুলাই মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে রাত ৮টার দিকে স্বামী, ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে ওই বেকারিতে ডিনার করতে যাই। এরপর ওই হোটেলের হলরুমে টেবিলে বসে অপেক্ষা করতে থাকি। মেন্যু দেখে খাবারের জন্য অর্ডারও করি। এর ৩-৪ মিনিট পরই অস্ত্রসহ ব্যাগ কাঁধে নিয়ে তিন-চার জন হোটেলে প্রবেশ করে। প্রবেশ করামাত্র তারা গুলি করতে থাকে। এরপর আমাদের টেবিলের কাছে এসে জিজ্ঞাসা করে আমরা মুসলিম কি-না? আমরা মুসলমান জানালে তারা বলে, আপনারা মুসলমান আপনাদের কোনো ক্ষতি করব না। আপনারা মাথা নিচু করে টেবিলে বসে থাকুন।

তিনি বলেন, ওই হোটেলের কাঁচে ঘেরা রুমে আনুমানিক ৮-১০ জন বা তার বেশি বিদেশি বসে ছিলেন। তারা ওই রুমে ঢুকে গুলি করতে শুরু করে। তখন আমাদের বলতে থাকে, আপনাদের ছেলে-মেয়েদের চোখকান বন্ধ করে রাখুন যেন, তারা কোনো কিছু দেখতে বা শুনতে না পায়। তারা দেখলে ভয় পেতে পারে। তখন আমি আমার ছেলে-মেয়ের চোখ বন্ধ করে রেখেছিলাম। তিনি আরও বলেন, ‘ওই ঘটনার কিছু সময় পরও তারা একটি ছেলে ও একটি কম বয়সী মেয়েসহ চার জনকে আমাদের টেবিলের কাছে নিয়ে আসে। ওই ঘটনার সময় বারান্দার একটা লাইট ছাড়া সব লাইট বন্ধ করে দেয়। রাত ১টা ৩০ মিনিটের দিকে একজন ওয়েটার এবং একজন ফরেনারকে বের করে নিয়ে আসে। ওয়েটারকে সরিয়ে দিয়ে ফরেনারকে গুলি করে। এরপরে আমাদের আশেপাশে পড়ে থাকা মৃতদেহগুলোকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাতে থাকে।

এ মামলায় গতকাল আদালতে আরো সাক্ষ্য দেন নিহত পুলিশের এসি রবিউল ইসলামের ভাই মো. শামসুজ্জামান ও তার খালাত ভাই মোল্ল­া মো. আনোয়ারুল আমিন। প্রসঙ্গত নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষক হাসনাত রেজা করিমের বিরুদ্ধে হামলায় জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর গত ২৬ নভেম্বর আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলার বিচার শুরু হয়। গতকাল পর্যন্ত মামলায় ২০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে।