সায়েন্স বী এক বিজ্ঞান-পোকা প্রজন্মের কারিগর

>> আরিফুল হাসান শুভ

 

একদিকে পাঠ্যপুস্তকে বিজ্ঞানের জ্ঞান অর্জনের সীমাবদ্ধতা আর অন্যদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান চর্চার জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুবিধার অভাব। আর তাই শিক্ষার্থীদের কাছে বিজ্ঞান যেন এক ভয়ের নাম। তবে কি এই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে বিজ্ঞানবিমুখ হয়ে গড়ে উঠবে একটা  প্রজন্ম? সমাধান খুঁজতে শুরু করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী মবিন সিকদার। তার স্বপ্নের সংগঠন ‘সায়েন্স বী’ এই জটিল সমীকরণেরই এক সহজ ও সুন্দর সমাধান।

২০১৮ সালের কথা। লক্ষ্য ছিল দেশের সব ছেলেমেয়ে যেন এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে মাতৃভাষা বাংলায় বিজ্ঞান চর্চা করতে পারে। শুরুটা হয় অরবিটাল নামে এক মাসিক ম্যাগাজিন প্রকাশের মাধ্যমে। তিন বছরে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজ সায়েন্স বী খুঁজে পেয়েছে তার আপন গতি। সায়েন্স বী’র সমস্ত কার্যক্রমের প্রাণকেন্দ্র তাদের ওয়েবসাইট যা বিজ্ঞান চর্চার এক মুক্তমঞ্চ। সেখানে রয়েছে ‘ডেইলি সায়েন্স’ বিভাগ, যাকে দেশের প্রথম বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বলা চলে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সমসাময়িক সব খবর ও আপডেট জানা যায় এখানে। রয়েছে বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে অসংখ্য লেখা নিয়ে ব্লগ বিভাগ। শিক্ষার্থীদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় ্তুপ্রশ্নোত্তর বিভাগটি ওয়েবসাইটের বিশেষ আকর্ষণ। এখানে তারা তাদের কৌতুহলী মনে উঁকি দেওয়া বিজ্ঞান বিষয়ক যে কোনো প্রশ্ন করতে পারেন নির্দ্বিধায়। মজার ব্যাপার হলো, প্রায় সাড়ে ছয় হাজার প্রশ্ন সম্বলিত আর্কাইভ এতই সমৃদ্ধ যে—কোনো প্রশ্ন করতে গেলে দেখা যায় সেটি উত্তরসহ ইতোমধ্যেই আছে। শুধু তাই নয়, শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ভাগাভাগির প্রতি উত্সাহিত করতে রয়েছে প্রশ্ন করে বা উত্তর দিয়ে পয়েন্ট অর্জন ও প্রতি মাসে সেরাদের জন্য নগদ অর্থ পুরস্কারের আকর্ষণীয় ব্যবস্থা। বর্তমানে প্রায় দশ  হাজার শিক্ষার্থী নিয়মিত ওয়েবসাইট পরিদর্শন করছেন এবং মাসিক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ অতিক্রম করেছে।

বিজ্ঞান শিক্ষামূলক কন্টেন্টগুলো সুন্দর গ্রাফিক ডিজাইন করা তথ্যচিত্র হিসেবে কখনো ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে, আবার কখনো ভিজুয়্যাল কন্টেন্ট হিসেবে ইউটিউবে প্রকাশ করা হয়। তাদের বিজ্ঞান গ্রুপের সদস্য সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। একইসঙ্গে রয়েছে ‘এই পোস্টে বিজ্ঞান কই’ নামে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক মিম গ্রুপ, যেখানে শিক্ষা ও বিনোদনের কাঙ্ক্ষিত সমন্বয়ই পরিলক্ষিত হয়। এই গ্রুপের সদস্য তথা শিক্ষার্থী সংখ্যা চার লাখের অধিক।

পথচলার গল্প বলতে গিয়ে প্রতিষ্ঠাতা মবিন সিকদার জানান, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টার আয়োজিত ইয়ুথ অন্ট্রাপ্রেনারশিপ বুথ ক্যামেপ তৃতীয় রাউন্ডে পৌঁছানোর গৌরব অর্জন করে সায়েন্স বী। সে বছর ডিসেম্বরে ইয়ুথ কার্নিভালে অংশ নেয় তারা। তারা বিজ্ঞানকে আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরতে নানা খেলার আয়োজন করে স্টল নির্মাণ করে। দু’দিনব্যাপী এই আয়োজনে পরিদর্শকরা বিজ্ঞান ও ভবিষ্যত্ উচ্চশিক্ষার নানা বিষয়ে জানতে পারেন। সেসময় থেকে নিয়মিতই লেখা, মিম, ডিজাইন ইত্যাদি বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আসছে তারা। উল্লেখ্য, গত বছর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের জন্য এক মাসব্যাপী অনলাইন মডেল টেস্টের আয়োজন করা হয়, এতে প্রতিদিনই হাজারের অধিক পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে তাদের প্রস্তুতি ঝালাই করেন। সমপ্রতি তারা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর একটি ভিন্নধর্মী ক্যামেপইনের আয়োজন করে শিক্ষার্থীদের হতাশার বিরুদ্ধে লড়াই করতে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াসে। মবিনের মতে, আমাদের দেশে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানভীতির মূল কারণ মুখস্তনির্ভরতা আর শিক্ষকদের সদিচ্ছার অভাব। সেইসঙ্গে অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং দেশে গবেষণা কাজের স্বল্পতা।

ভবিষ্যত পরিকল্পনা সমপর্কে জানতে চাইলে এই তরুণ উদ্যোক্তা বলেন, ‘আমরা বিজ্ঞান শিক্ষামূলক ভিডিও কন্টেন্ট তৈরি করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। স্বপ্ন দেখি একদিন আমাদের দেশ থেকে বিজ্ঞানী তৈরি হবে—যার জীবনে সামান্য হলেও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে সায়েন্স বী।’