করোনাকালে রাস্তাঘাট যখন ফাঁকা সুনসান তখন পিঠে বড় ব্যাগ নিয়ে তাদের সাইকেল চালাতে দেখা যায় নগরেরে পথে পথে। গাছের ছায়ায় বসে কেউ কেউ একটু জিরিয়ে নিচ্ছেন এমন দৃশ্যও চোখে পড়ে। প্রায় সারাটা দিন ধরেই শহরের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছুটে চলে তাদের বাহন। সাইকেল, মোটরসাইকেল কখনো পায়ে হেঁটে পণ্য মানুষের বাসায় বাসায় পৌঁছে দিচ্ছেন তারা। করোনাকালে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয় উঠেছেন ‘ডেলিভারিম্যান’।
মাসের বাজার হোক কিংবা ওষুধ কেনা, পিত্জা হোক কিংবা বিরিয়ানি—সবকিছুই তাদের সহায়তায় নিমিষেই চলে আসে বাসার দোরগোড়ায়। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে যখন সবাই ঘরে বন্দি তখন করোনার সম্মুখ যোদ্ধা হিসেবে এই ডেলিভারি ম্যানরাই চষে বেড়াচ্ছেন নগরের পথে পথে। দোকানপাট, হাটবাজার, শপিং মল, রেস্তোরাঁ সবকিছুই যখন বন্ধ তখন তারাই হয়ে উঠেছেন পণ্য ঘরে পৌঁছে দেওয়ার একমাত্র মাধ্যম। ক্রেতা-বিক্রেতার যোগসূত্র ঘটিয়েছেন এই ডেলিভারিম্যানরাই।
উন্নত বিশ্বে ব্যস্ত জীবনে মানুষের হাতের নাগালে পণ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া অনেক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছে। এতে ব্যবসার পরিধি ও পরিমাণও বেড়েছে। একই সঙ্গে একশ্রেণির মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের নগর জীবনে পণ্য ঘরে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ডেলিভারিম্যান একেবারেই নতুন সংযোজন। প্রাচীনকালের ডাক ব্যবস্থাই এখন সময়ের প্রয়োজনে মানুষের চাহিদাকে মাথায় রেখে বিস্তৃত হয়েছে। এই চিঠি বিলির জন্য একটা সময় ডাক পিয়ন ছিলেন, যারা বাসায় চিঠি বিলি করতেন। এখনো রয়েছে সে ব্যবস্থা। চাহিদা কমে আসায় তার প্রচলনও গেছে কমে। এখনকার ছেলেমেয়েদের কাছে গল্পেরই মতো। সেই চিঠি মূল শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে নিয়ে যেতেন ‘রানার’রা। তা নিয়ে ভূপেন হাজারিকার বিখ্যাত গান রয়েছে ‘দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে রানার- রানার/ কাজ নিয়েছে সে নতুন খবর রানার’।
পরবর্তীকালে বেশকিছু কুরিয়ার সার্ভিস দেশ জুড়ে পণ্য পরিবহন সেবা চালু করলেও সেটা সীমিত পর্যায়েই ছিল। এই করোনা পরিস্থিতিতেই বাংলাদেশে ডেলিভারিম্যানের চাহিদা বেড়ে গিয়েছে। মানুষের যেমন পণ্য প্রয়োজন তেমনি ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও লকডাউন অবস্থায় ব্যবসা সচল রাখার উপায় মিলেছে। সেই সঙ্গে যখন মানুষের কাজের ক্ষেত্র কমে আসছে সেই সময় অনেক তরুণের জন্য কাজের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে।
তবে, সমাজ জীবনে ডেলিভারিম্যানরা প্রয়োজনীয় হলেও ক্রেতাদের কাছে এবং যারা তাদের কাজ দেয় সবার কাছেই সঠিক মূল্যায়ন পায় না। তাদের কাজকে মূল্যায়ন করা হয় না। তাদের কাজের মজুরি খুবই নগণ্য। করোনাকালে এই কঠিন পরিস্থিতিতেও তাদের কাজ অবমূল্যায়িত। একই সঙ্গে তাদের স্বাস্থ্যনিরাপত্তাকেও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে না প্রতিষ্ঠানগুলো।
বেশ কয়েক জন ডেলিভারিম্যানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, প্রতিষ্ঠানভেদে ডেলিভারি চার্জ ভিন্ন ভিন্ন। তাছাড়া, পণ্যের আকারভেদেও ডেলিভারি চার্জ ওঠানামা করে। তবে, গড়ে রাজধানীতে ডেলিভারি চার্জ ৬০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া, অনেকে মাসিক বেতনের ভিত্তিতেও কাজ করছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।
মোস্তাকিম নামের একজন ডেলিভারিম্যান জানালেন, তিনি কলেজে পড়াশোনা করেন। তার বাবা একটি দোকানে সেলসম্যানের কাজ করতেন। গতবছর রোজার ঈদের পরে তার চাকরি চলে যায়। এরপর ডেলিভারিম্যানের কাজ নিয়েছেন তিনি। তার বাবাও ডেলিভারির কাজ করছেন। দুজনে মিলে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন। এমনি শত শত তরুণ এখন নিয়োজিত রয়েছেন এ কাজে।
করোনাকালে রোগীদের কাছে অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছানো, ওষুধ পৌঁছানো, কিংবা অসুস্থ রোগীর টেস্ট ও রিপোর্ট পৌঁছানো সবই করছেন ডেলিভারিম্যানরা। শুধু কি তাই, দেশে অনলাইন পোশাক ও খাবারের ব্যবসা টিকেই আছে হোম ডেলিভারিম্যানদের কল্যাণে। বেশকিছু কুরিয়ার সার্ভিসও দেশ জুড়ে পণ্য বাসায় পৌঁছে দেওয়ার সেবা ব্যবস্থা চালু করেছে। যার কারণে, অনেক অনলাইন ব্যবসায়ীর পণ্য যেমন ক্রেতার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে পাশাপাশি তার টাকাও বিক্রেতার হাতে পৌঁছে যাচ্ছে ডেলিভারিম্যানের সহায়তায়।
দেখা যাচ্ছে, চালডাল, দারাজ, আলেশা মার্ট এ সময়ে প্রয়োজনীয় পণ্য বাসায় পৌঁছে দিচ্ছে সুনামের সঙ্গে। বিভিন্ন সুপার শপও নিজেরাই বাসায় পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সুবিধা দিচ্ছে ক্রেতাদের।
এ প্রসঙ্গে ‘স্বপ্ন’-এর ধানমন্ডি শাখার ব্যবস্থাপক জানালেন, আমরা ক্রেতাদের বাসায় পণ্য পৌঁছে দিচ্ছি। আমাদের নিজস্ব ডেলিভারিম্যান দিয়ে এ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এদিকে, পণ্য কেনার চাইতেও নগর জীবনে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে অ্যাপভিত্তিক খাবার পৌঁছানোর সার্ভিসগুলো। এর মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে ফুড পান্ডা, পাঠাও ফুডস, সহজ ফুডস, হাংরি নাকি প্রভৃতি। এছাড়া, বেশকিছু রেস্টুরেন্ট নিজেরাই ডেলিভারি দিয়ে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে কেএফসি, পিত্জা হাট প্রভৃতি।
ইত্তেফাক/বিএএফ