ওরা সমাজের প্রতিবন্ধকতা নয়

মানুষের বিচিত্রতার শেষ নেই। কেউ একটু বেশি স্বাস্থ্যবান হলে, কারো স্বাস্থ্য কম। কারো বুদ্ধি বেশি হলে, কারো আবার কম। কেউ বেশি কথা বলে, কেউ বলে কম। কম-বেশির এই তফাত নিয়েই এগিয়ে চলে আমদের জগত্সংসার। এই তফাত মানুষের রুচিতে, আচার-ব্যবহারে, রীতি-নীতিতে, সামর্থ্য-সক্ষমতাতে। প্রতিবন্ধী বলতে বুঝায় এক ধরনের বিশেষ মানুষ, যারা সুস্থ-সবল কিন্তু সক্ষমতা সাধারণ মানুষের থেকে একটু কম। এটি কোনো রোগ নয়; সক্ষমতার তারতম্য মাত্র। প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নয়, অভিশাপও নয়। তারাও আমাদের মতোই মানুষ। তাদেরও বেঁচে থাকার অধিকার আছে, স্বাদ-আহ্লাদ আছে। ‘প্রতিবন্ধী’ শব্দটা একটু শ্রুতিকটু শোনায়। তাই বর্তমানে তাদেরকে ‘বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠী’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠী সমাজের সম্পদ। তাদের মধ্যে লুকিয়ে আছে অনেক সুপ্ত প্রতিভা, যা কাজে লাগিয়ে আমরা সমাজ-রাষ্ট্রের মঙ্গল সাধন করতে পারি। বর্তমানে বিশ্ব জুড়ে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠী তাদের বিশেষ দক্ষতার প্রমাণ দিচ্ছেন। তার একটা বড় উদাহরণ অলিম্পিক। আমাদের দেশেও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছেন। তাদের এই সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করলে চলবে না। তাদেরকে আরো বেশি বেশি উত্সাহিত করতে হবে। সরকারের ভূমিকা এক্ষেত্রে ইতিবাচক। সরকারি চাকরিতে তাদের জন্য বিশেষ কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে; সাম্প্রতিক বাজেটগুলোতে তাদের জন্য পৃথক ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে; বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের জন্য বিশেষ চাকরি মেলারও আয়োজন করা হচ্ছে। যা স্পষ্টতই তাদের প্রতি সহানুভূতিশীলতার বহিঃপ্রকাশ। সরকার সহানুভূতিশীল হলেও পরিবর্তন হচ্ছে না আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির। একবিংশ শতাব্দীর এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিপ্লবের স্বর্ণশিখরে এসেও যদি প্রতিবন্ধীকে পাপের ফল হিসেবে উপস্থাপন করা হয় তবে তার মতো দুঃখজনক ঘটনা আর হতে পারে না।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষরারা সমাজের উন্নয়ন, অগ্রগতিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না; যারা তাদের হেয়প্রতিপন্ন করে তারাই বরং কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানসিকতার পরিচয় দিয়ে যুগের অগ্রযাত্রার চাকাকে টেনে ধরে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পুনর্বাসন করা হলে তারা দেশের সম্পদে পরিণত হবে। নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবাইকেই এ অবস্থার উন্নয়নে কাজ করতে হবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য মানবিক হতে হবে। অন্তরটাকে বৃহত্ করতে হবে। রাষ্ট্রীয় যে কোনো প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে তাদের কথা চিন্তা করতে হবে। তাদের সক্ষমতার দিকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের শুধু চাকরি দিলেই চলবে না। তাদের চাকরি করার পরিবেশও তৈরি করে দিতে হবে। সবার আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠী বান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাদের কথা মাথায় রেখে ভবনের সিঁড়ি ও শৌচাগার নির্মাণ করতে হবে।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠী আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার একটি অংশ। তাই দেশের সমস্ত উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাদের কাজে লাগাতে হবে। তাদের কাজের মাধ্যমে এক দিকে তারা যেমন হবে স্বনির্ভর, অন্যদিকে দেশ এগিয়ে যাবে সামনের দিকে। যদি আমরা সচেতন লোকজন তাদেরকে তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজে লাগাতে না পারি, তাহলে তারা হয়ে উঠবে আমাদের ওপর বোঝা। আর সে বোঝা টানতে হবে আমাদেরকেই। তাই সরকারের পাশাপাশি দেশের বিত্তশালী লোকদেরকেও এগিয়ে আসতে হবে। গণমাধ্যমকেও সদয় হতে হবে তাদের প্রতি। গণমাধ্যমের সদয় ভূমিকা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠী নিয়ে সমাজে বিদ্যমান ভ্রান্ত ধারণাগুলোকে দূর করতে সাহায্য করবে।

লেখক :শিক্ষার্থী, ড্যাফোডিল আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা