সোনালী ব্যাংকের সাড়ে ১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় ভুল আসামি জাহালমকে ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তাত্ক্ষণিক মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে মানবিক এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, নরসিংদীর ঘোড়াশালের মিল থেকে জাহালমকে পুলিশ আটক করে। প্রায় তিন বছর বিনা বিচারে মিথ্যা মামলায় আটক ছিলেন নিরপরাধ জাহালম। ৩৫ বছর ধরে মানুষের বাড়িতে কাজ করেন জাহালমের মা। এমন একটি পরিবারের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের বিষয়টি রাষ্ট্রকে বিপাকে ফেলা ও প্রশ্নবিদ্ধ করা ছাড়া আর কিছুই নয়। আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন, একজন নির্দোষ ব্যক্তিকে এক মিনিটও কারাগারে রাখার পক্ষে আদালত নন এবং বিনা দোষে জাহালমকে কারাগারে রাখা আরেকটি জজ মিয়ার নাটকের মতো ঘটনা। একই সঙ্গে ভুল তদন্তের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের যথাযথ চিহ্নিত করার নির্দেশ দেন আদালত। অন্যথায়, আদালত এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে বলেও স্পষ্ট জানিয়ে দেন।
আইন ও বিচারের প্রধান লক্ষ্য প্রকৃত অপরাধীকে ন্যায়বিচার সাপেক্ষে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি নিশ্চিত করা। কিন্তু বিনা বিচারে এভাবে দীর্ঘদিন বিভিন্ন অপরাধীর সঙ্গে কারাবাস করা বড়ই অমানবিক এবং অপ্রত্যাশিত। মামলাজট দ্রুত নিষ্পত্তি করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে আজ। বিনা বিচারে আটক মানুষকে সহায়তার জন্য মামলাগুলো ‘দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে’ প্রেরণ করে স্থায়ী জামিনের পাশাপাশি নিষ্পত্তির মাধ্যমে মুক্তি অথবা শাস্তি প্রদান করা যেতে পারে। কেননা অপরাধ প্রমাণিত না হলে নিরীহ-নির্দোষ মানুষের দীর্ঘ কারাবাসের দায়ভার কে নেবে? অন্যায়ভাবে কেউ মিথ্যা মামলা দিয়ে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে ফাঁসিয়ে দিলে তাকেও শাস্তির আওতায় আনা দরকার। এমনিতেই বাংলাদেশের অধিকাংশ কারাগারে ধারণক্ষমতার চেয়ে অধিক বন্দি রয়েছেন। যেখানে অপরাধীদের সঙ্গে একপ্রকার দুঃসহ জীবনযাপনে বাধ্য হয় নিরীহ-নির্দোষ মানুষ।
দেশের দরিদ্র, অসহায়, স্বল্প আয়ের মানুষের ন্যায়বিচারের স্বার্থে আইনি সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন-২০০০’ প্রণয়ন করা হয়, যার অধীনে সুপ্রিম কোর্টসহ দেশের ৬৪ জেলায় লিগ্যাল এইড কমিটি বিনামূল্যে আইনি সেবা দিয়ে থাকে। তাদের একটি জাতীয় হেল্পলাইন রয়েছে (নম্বর-১৬৪৩০) যার যথেষ্ট প্রচারও দরকার। স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি), বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা (বিএমবিএস) এবং লিগ্যাল এইড কমিটির সদস্যদের সমন্বয়ে একটি কমিটি যেন বিনাবিচারে নিরীহ মানুষের বন্দিজীবন প্রতি ছয়মাস পর পর সঠিকভাবে ‘মনিটরিং’ করতে পারে, সেই মানবিক ব্যবস্থা করা দরকার। কেননা বিনা বিচারে বছরের পর বছর কারাবাস স্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন। পত্রিকার বিভিন্ন তথ্য থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশের জেলগুলোতে ৫ থেকে ১৮ বছর ধরে বিনা বিচারে আটক আছেন প্রায় ৪৬২ (২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী) জন । আর ৫ বছরের নিচে বিনা বিচারে কতজন আছেন তার কোনো তথ্যই নেই। একজন মানুষের অপরাধ যদি ৫-১৮ বছরেও প্রমাণিত না হয়, তাহলে অপরাধবিজ্ঞান যাই বলুক, সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা স্পষ্ট যে, তিনি প্রকৃত অপরাধী নন। অতি দ্রুত বিষয়টির একটি স্থায়ী এবং টেকসই সমাধান দরকার যেন আর কখনো কোনো নিরীহ মানুষের মূল্যবান জীবন কারাগারের চার দেয়ালের মাঝে নিঃশেষ না হয়ে যায়, সামাজিক সম্মান নষ্ট না হয় এবং একটি পরিবারকে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হতে না হয়।
কিছুদিন আগে দেশের বিভিন্ন কারাগারে বিনা বিচারে ৫ বছরের বেশি সময় আছে এমন বন্দিদের তালিকা চেয়ে কারাগারগুলোতে চিঠি পাঠিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিস। নি:সন্দেহে এটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এমন ন্যায়সঙ্গত কর্মকাণ্ডে বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা বেড়েছে মানুষের। কেননা মানবিক ও সুসংগঠিত বিচার বিভাগ ও আইন পদ্ধতি একটি দেশের সুশাসনের পূর্বশর্ত এবং অপরিহার্য।
n লেখক:পিএইচডি গবেষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও
বৈশ্বিক সুশাসন, ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি, চীন
এবং শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বশেমুরবিপ্রবি, গোপালগঞ্জ