দাও ফিরিয়ে সেই ঘুম

সুবোধ চন্দ্র বিশ্বাস

একটা গান আছে—আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম! কথা বলে—যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ। কিংবা রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলা যায়, দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না। কয়েকশো বছর আগের কথা একটু ভেবে দেখুন। তখন না ছিল ইলেকট্রিসিটি, না ছিল ল্যাপটপ, ট্যাবলেট, স্মার্টফোন। সূর্য ওঠার সঙ্গে ঘুম ভাঙত, সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমাতে যেত মানুষ। মানুষের দেহঘড়ি হাজার হাজার বছর ধরে সেভাবেই তৈরি। কিন্তু বিজ্ঞানের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে আমরা উঠে পড়ে লেগে গেলাম সেই দেহঘড়িরর ছন্দকে ভাঙতে।

এটা এখন কে না জানে, বর্তমানে অনিদ্রার সব চেয়ে বড় কারণ এসব ইলেকট্রনিক ডিভাইস। আমাদের দেহঘড়ি হাজার হাজার বছর ধরে যেভাবে সেট করা আছে, আমরা সেটাকে এখন প্রতিদিনই ভাঙছি। ভাঙছি নিজেদেরকেই। নিওরোসায়েন্স পত্রিকায় এই সমস্যা নিয়ে চমত্কার কিছু নিবন্ধ আছে। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা জেডি মোয়ার ঘুমের সঙ্গে লড়াই করতে করতে ক্লান্ত হয়ে এক সময় সন্ধান শুরু করলেন এর পরিত্রাণের উপায়। কীভাবে সহজে পরিপূর্ণ ঘুমোনো যায়—তা খুঁজতে খুঁজতে তিনি দেখেন ব্রেনে যে ঘুমের ঘড়ি আছে, যে ঠিক করে কখন ঘুমের সময় আর কখন জেগে থাকার, তাকে বোকা বানাতে আলোই হল সব চেয়ে বড় ভিলেন। তা সে সূর্যের আলো হোক কী ল্যাপটপ, আইপ্যাডের আলো। আলো দেখলেই ঘুমের ঘড়ি ধরে নেয় এটা দিনের বেলা। কাজের সময়। ফলে ঘুমোনোর জন্য যে যে প্রস্তুতি চলার কথা ব্রেনে, তা না হয়ে সে কাজ করার জন্য উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। বারোটা বেজে যায় ঘুমের। জেডি তখন শুরু করলেন এক মজার খেলা। সূর্য ডোবামাত্র ল্যাপটপ, স্মার্ট ফোন অফ করে, ঘরের লাইট নিভিয়ে, এমনকী ফ্রিজের মধ্যে যে আলো জ্বলে তা পর্যন্ত নিভিয়ে অন্ধকারে বসে গান শুনতে লাগলেন। খানিকক্ষণের মধ্যে অন্ধকার চোখে সয়ে গেল। ফলে বাথরুম-টাথরুম যেতেও আর আলো জ্বালতে হল না। এভাবে কাটল দু’-চারদিন। তেমন কিছু হলো না। মধ্যরাত পার করেই ঘুম এলো। তবে ছেঁড়া-ছেঁড়া ঘুম নয়, সকালে উঠে তরতাজা লাগে—এমন ঘুম।

সপ্তাহ গড়িয়ে যাওয়ার আগেই ঘুমের সময় এগোতে লাগল। শেষমেশ দেখা গেল রাত ৯টায় তিনি ঘুমিয়ে পড়ছেন। ৮ ঘণ্টার পরিপূর্ণ ঘুম হচ্ছে তার। এবং সকালে যখন উঠছেন, তিনি যেন এক নতুন মানুষ। আধুনিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে যে মানুষকে তিনি ভুলে ছিলেন এত কাল। জেডির এই অভিজ্ঞতা ঘুম নিয়ে গবেষণার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল। নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক ও সেন্টার ফর স্লিপ অ্যান্ড সার্কাডিয়ান বায়োলজির ডিরেক্টর জানালেন, মোয়ারের অভিজ্ঞতা ও সামপ্রতিক গবেষণা থেকে যা জানা যাচ্ছে তা হলো, নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমিয়ে পড়া ও সঠিক সময়ে জেগে ওঠার যে ছন্দ আছে আমাদের শরীরে, যাকে বলে সার্কাডিয়ান রিদম, তাকে সত্যিই কিছুটা বোকা বানাতে পারে ল্যাপটপ, স্মার্ট ফোন ইত্যাদি থেকে বিচ্ছুরিত আলো। কাজেই কারও যদি ঘুমের অসুবিধে থাকে ঘুমের অন্তত দু-ঘণ্টা আগে থেকে এ সব ব্যবহার করা যাবে না।

আর ঘুমের প্রধান শত্রু হল আলো। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গোলমাল করে নীল রংয়ের আলো, যা আছে সূর্যের চড়া আলোয়, আছে ডেস্কটপ বা ল্যাপটপে, আইফোনে। কোনো চাষি, যিনি সারা দিন রোদে পুড়ে কাজ করেন বা রোদে ঘুরে মার্কেটিং করা যার কাজ, তাদের তুলনায় অফিসে কৃত্রিম ও কম আলোয় বসে যিনি কাজ করেন, তার আলোর প্রতি সেনসিটিভিটি অনেক বেশি থাকে বলে ঘুমের সমস্যাও তারই বেশি হয়। এটা তো আমরা সাধারণভাবেই বুঝি, ঘুমোনোর আগে নিয়মিত জটিল কাজকর্ম করলে তা ঘুমের জন্য সহায়ক হবে না একেবারেই। সুতরাং একটি চমত্কার ঘুম এখন আপনার হাতে। যেভাবে চলছেন, সেভাবেই চলবেন—নাকি জেডির মতো নতুন করে সাজাবেন আপনার যাপিতজীবন? কী করবেন, ভেবে দেখুন।

n লেখক : শিক্ষক, সাংবাদিক