আন্তর্জাতিক কূটনীতির আরেক দুর্বিষহ রণক্ষেত্র হয়ে উঠবে আফগানিস্তান

তালেবানের কাবুল দখলের আজ তৃতীয় দিন। আফগানিস্তান জুড়ে বিশৃঙ্খলা, আতঙ্ক আর চোরাগুপ্ত সন্ত্রাসের ভয়ংকর মুখ বৃহত্তর সন্ত্রাসকে চওড়া করছে। বাড়িঘর ছেড়ে মানুষ পালাচ্ছে। যেমন দক্ষিণ দিকে, তেমনি উত্তর সীমান্তপথে। কে কোথায় আশ্রয় নেবে, ঠিক নেই। ভাবদর্শের দিক থেকে সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ উজবেকিস্তান আর তাজিকিস্তান দরজা খুলে দিয়েছে, মানবিকতার কারণে। কিন্তু দূরদূরান্ত থেকে সব মানুষের এসব দেশে পাড়ি দেবার সাহস কোথায়? খানাখন্দে ভরা রাস্তা, বন্ধুর পথ। যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন। এরকম উদ্ভট আর অতর্কিত পরিস্থিতিতে দেশের মধ্যেই সাধারণ মানুষ আর আগের সরকারের দুর্নীতিগ্রস্তদের অবরুদ্ধ হয়ে থাকা ছাড়া ভিন্ন উপায় নেই। তালেবান নেতৃত্বের  আশ্বাসও কাজে আসছে না। কারণ তারা ক্ষমতায় থিতু হলেই, অনেকের আশঙ্কা কতলের খড়্গ গলায় নেমে আসবে। ইরানে ১৯৭৯ সালের শিয়া বিপ্লবের পর এরকমই ঘটেছিল। সারা দুনিয়া একদিকে, আর আয়াত উল্লাহ  খোমেইনির নেতৃত্বে বিপ্লবী পরিষদ আরেক দিকে। দেশ জুড়ে ব্যক্তি হত্যার (যা ইসলামে গর্হিত অপরাধ) রক্ত ছড়িয়ে দিল খোমেইনির অনুগামীরা। পূর্ব-পশ্চিমের কোনো চাপের কাছেই তারা মাথা নোয়াননি। রাতের অন্ধকারে বাড়ি বাড়ি থেকে ছাত্র, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিকদের তুলে এনে হত্যা করাটা বিপ্লবোত্তর ইরানের রেওয়াজ হয়ে উঠল। সশস্ত্র বিপ্লব কিংবা মুক্তিযুদ্ধের পরিণাম সাধারণত এরকম, এরকমই হয়ে থাকে। গত ৫০ বছরে একমাত্র ব্যতিক্রম বাংলাদেশে। শত্রু নিধন ব্যাপকহারে সংঘটিত হয়নি। বিজয়ী যোদ্ধারা নিষ্ঠুর প্রতিশোধে মেতে ওঠেনি।

আফগানিস্তানে এরকম হতে পারে, নাও হতে পারে। সুন্নি তালেবান যদি হজরত মোহাম্মদের আদর্শের সাচ্চা অনুগামী হয়, যদি পরাজিত শক্তিকে ক্ষমা প্রদর্শনের নীতি অবলম্বন করে তাহলে প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের ভয়ংকরকে এড়িয়ে তারা শাস্তির পথ বেছে নেবে। দায়িত্ব পেলে অনেক সময় সশস্ত্র যোদ্ধারা বদলে যায়, পুনর্গঠনে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। তালেবান নেতৃত্বও বদলে যেতে পারে। এটা এক ক্ষীণ সম্ভাবনা। ক্ষীণ বলতে হচ্ছে এ কারণেই যে, বহুজাতি উপজাতিতে তালেবান বাহিনী বিভক্ত। সম্মুখশত্রুকে হটানোর তাগিদে তারা এক হয়েছিল। তাদের ঐক্য গড়ার প্রথম বার্তা দেয় পাকিস্তানের আইএসআই। আশির দশকে আফগান মুলুকে সোভিয়েত রাশিয়ার দখলমুক্ত করতে। বহু গোষ্ঠীর ঐক্যের জোরেই ১৯৯৬ সালে মোল্লা ওমরের নেতৃত্বে তারা ক্ষমতায় আসে। লাদেনের আল-কায়দার সমর্থন না পেলেও তালেবান আফগানিস্তান দখল করে নিত। গোড়াতে সামাজিক ভিত ছিল না। কিন্তু ২০০১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর, জর্জ বুশ যখন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে আকাশপথে বিমান হানা শুরু করলেন, সেদিন থেকেই তালেবানের সামাজিক ভিত প্রশস্ত হতে থাকল। আফগানিস্তানের গত কুড়ি বছরের ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করল যে, বাইরে থেকে সামরিক হস্তক্ষেপ ঘটিয়ে অপছন্দের শক্তিকে দমন করা যায় না। ২০০১ সালে, আমরা বলেছিলাম, তালেবানকে রুখতে ভয়ংকরের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে আমেরিকা। ভিয়েতনামের পর কাবুলেও মুখ পোড়াতে হবে। পুড়ল না? ঘরে বাইরে নিন্দিত হয়ে সেনা সরানোর প্রক্রিয়া শুরু করল। তড়িঘড়ি ন্যাটো বাহিনীর প্রত্যাহারও আমেরিকার আরেক ভুল। তার এ ভুলের খেসারত দিতে হবে দরিদ্র, পীড়িত, অবরুদ্ধ আফগান জনগণকে।

ওয়াশিংটন ভেবেছিল, হামিদ কারজাই থেকে আশরাফ ঘানির পুতুল সরকারকে সামনে রেখে পরিস্থিতি সামাল দেবে। হলো না। দুঃশাসন, দুর্নীতি আফগানিস্তানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করল এবং এসবের প্রতিরোধের একমাত্র সম্মুখশক্তি হয়ে উঠল তালেবান। পুতুল সরকারকে সামনে রেখে ক্ষমতালোভী ভয়ংকরদের যে সামাল দেওয়া যায় না, তার নিকটতম দৃষ্টান্ত ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের প্রায় তিন দশকের বাংলাদেশ, সাদ্দাম-উত্তর ইরাক এবং গাদ্দাফি জামানার অবসানের পরের দিশাহীন, গৃহযুদ্ধমুখর লিরিয়া।

বাংলাদেশের সৌভাগ্য, শেখ হাসিনার মতো জননেত্রীর দূরদৃষ্টি, শাসন কৌশল ও স্বনির্ভরতা দেশটিকে এ পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছে, প্রতিমুহূর্তে জাগ্রত রাখছে তার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে, যে চেতনা তাকে প্রতিশোধকামী হতে দেয়নি, বরং হিংসা ও অস্ত্রের রাস্তা ছেড়ে উন্নয়ন আর সহিষ্ণুতার দিকে এগোতে সাহায্য করছে।

আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে এরকম হওয়া খুব কঠিন। কারণ তালেবান যে শাসনব্যবস্থা দাবি করছে, তা ভাষা ও জাতিনির্ভর নয়। তাকে সংহত মুক্তিযুদ্ধ করতে হয়নি। সে যুদ্ধ করেছে, এখনো করছে আমেরিকার বিরুদ্ধে। যে বাইরে থেকে সেনা পাঠিয়ে গায়ের জোরে তাঁবেদার করে রাখতে চেয়েছে বৃহত্তর আফগানিস্তানকে। আধুনিক যুগে যা অসম্ভব এবং অবাস্তব হস্তক্ষেপ মাত্র। দ্বিতীয়ত, তালেবানকে যতটা মূর্খ, কৌশলহীন বা লক্ষ্যহীন ভাবা হচ্ছে, তারা তা নয়। গত শতাব্দীর বিশ ও তিরিশের দশকে জামাল উদ্দিন আফগানি যে প্যান ইসলামের ডাক দিয়েছিলেন, যে ডাকে সাড়া দিয়ে অবিভক্ত ভারতের জামাত-এ-ইসলামি তার সশস্ত্র রাজনৈতিক রূপরেখা তৈরি করেছিল, সেই ভাবাদর্শই প্রকারান্তরে তালেবানের কর্মকাণ্ডের উত্স। অর্থাত্ সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে আগে ক্ষমতা দখল করো, পরে কঠোর শাসন চাপিয়ে দাও সমাজের সব স্তরে। প্রবল প্রতিরোধ অতিক্রম করে, শিয়া ঐতিহ্যকে অনুসরণ করে এই কর্মটাই করেছিল ১৯৭৯ সালের পরে, ইরানের শিয়া বিপ্লবীরা। কণ্ঠরোধ, ব্যক্তিহত্যা, মুক্তচিন্তার হত্যা এবং মহিলাদের অবদমন বিপ্লবীদের অভ্যাস হয়ে উঠল। বিশ্বের জনমত একঘরে রেখেও তাদের রুখতে পারেনি। যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েও দমাতে পারল না ইরানি শাসকগোষ্ঠীর দুঃসাহসকে। বরং অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অবরোধ যে জেদ তৈরি করল সে জেদ তাকে রাশিয়া ও চীনের নিকটস্থ করে তুলল। শিয়া ‘বিপ্লবের বাণী’ প্রতিবেশী আরব দেশগুলিতে ছড়িয়ে দেবার সাহস জোগাল এবং নিজেকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির সহযোগী হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখাতে থাকল। কিউবাকেও একঘরে করে রেখে আমেরিকা রুখতে পারেনি। ট্রাম্পের ভুল নীতি ইরানকে দমাতে পারেনি। ইরানের রাষ্ট্রনীতি আমাদের অপছন্দ হতে পারে, কিন্তু অস্ত্রে আর ক্ষমতার দম্ভে আজ তার অবস্থান অস্বীকার করা যায় না। ইতিহাসের বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়া অন্যায়।

তালিবানি আফগানিস্তান কোনদিকে মোড় নেবে, এক্ষুনি নিশ্চিত অনুমান সম্ভব নয়। তবু যেসব পূর্বাভাস দেখা যাচ্ছে, খানিকটা বলা জরুরি। এক. গৃহযুদ্ধ, অপশাসন আর গণহত্যায় গোটা দেশের অনিশ্চয়তা প্রকট হয়ে উঠবে। দুই. পশ্চিমি প্ররোচনায় পা দিয়ে সম্ভাব্য তালিবান সরকারকে একঘরে রাখার প্রয়াস শুরু হবে। তিন. ইউরোপীয়, ইউনিয়ন, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার কৌশলকে রুখতে রাশিয়া, চীন ও চীনের প্রশ্নহীন সহযোগী পাকিস্তান সরাসরি তালেবানের পাশে দাঁড়াবে এবং মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গরিব দেশটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আরেক ‘রণক্ষেত্র’ হয়ে উঠবে। সীমান্তবর্তী ইরানও দূরত্ব বজায় রাখতে পারবে না। চার. পাকিস্তান পাশে ছিল। আজও আছে। পাশে থাকার খেসারত দিতে হবে তাকে। তিরিশ লক্ষ আফগান শরণার্থীর চাপের ওপর  অতিরিক্ত উদ্বাস্তুর চাপ বাড়বে। পাঁচ, মানবিকতার খাতিরে কোনো কোনো দেশ শরণার্থীদের আশ্রয় দেবে। আবার অভ্যন্তরীণ বাধ্যবাধকতার কারণে অনেক দেশই আফগান শরণার্থীদের জায়গা দেবে না। তার মানে, মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের মতো আরো একটি উদ্বাস্তু প্রজাতি রাজনীতি ও কূটনীতিক্লিষ্ট পৃথিবীর দেশে দেশে ঘুরবে, আশ্রয়ের খোঁজে ছুটবে। সভ্যতা আর মানবতার সামনে এও আরেক আশু লজ্জা।

n লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা