উড়ন্ত পাখির দৃষ্টি যেমন চেনা-অচেনা নদনদীর তীরবর্তী সাদা বালির ওপর পড়ে থাকা কিংবা হাসপাতালের বাইরে সাদা কাপড়ে মুড়ে থাকা শত শত মৃতদেহের ছবি দেখে চমকে যায়, আমাদের চোখের সামনেও সেই ছবি নিরন্তর উঁকি দিচ্ছে, আমাদের অবসাদগ্রস্ত করছে—মনে জাগিয়ে তুলছে এক ভয়ার্ত হাহাকার। এসব ক্ষত সময়ের অভিঘাতে আমাদের ব্যক্তিগত শরীরে, দেশের শরীরে, গভীর অবচেতনে খোদাই হয়ে যাওয়া এক অবিচ্ছেদ্য স্মৃতিসংকেত হয়ে বিরাজ করবে অনেক দিন। স্মৃতিতে অবদান রাখলেও অতিমারির প্রভাবটি কিন্তু সমাজ এবং রাষ্ট্রজীবনের চিন্তায় বর্তমান সময়ে তেমন কোনো ব্যতিক্রম কিছু এনে দিতে পারছে না। তবে সমাজ এ নিয়ে চিন্তা করুক আর না করুক, এই কোভিড অতিমারি আমাদের এক নিদারুণ কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সত্যটি হলো, আর্থিক অসাম্যের অভূতপূর্ব বৃদ্ধি। সমাজে অসাম্য আগেও ছিল; বেড়েও যাচ্ছিল গত তিন দশক ধরে দেশে এবং বিদেশে; কিন্তু বর্তমান অসাম্যের প্রকৃতি আগের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং অভূতপূর্ব।
আর্থিক ক্ষেত্রে অসাম্য কীভাবে ঘটছে তার একটি বাস্তব বিশ্লেষণ তুলে ধরছি। ২০২০-২০২১ অর্থ বছরে জাতীয় আয়ের কিছুটা সংকোচন হয়েছে আমাদের দেশে; কিন্তু অর্থনীতিবিদরা অনুমান করছেন, ২০২১-২০২২ অর্থ বছরে জাতীয় আয় বৃদ্ধি পাবে। জাতীয় আয়কে বাংলাদেশের সব মানুষের আয়ের যোগফল হিসাবে দেখলে অসাম্যের অঙ্কটা স্পষ্ট হবে। ধরা যাক, ২০১৯-২০ অর্থ বছরে জাতীয় আয় ছিল ১০০ টাকা। সেখান থেকে পরের বছর (২০২০-২০২১) কমে গিয়ে হলো ৯৩ টাকা। এবার যদি (২০২১-২০২২) অর্থবছরে জাতীয় আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১০০ টাকা ৫০ পয়সা, তাহলে ধরে নিব ২০১৯-২০২০ সালে জাতীয় আয় যা ছিল ২০২১-২০২২ সালে এসে তাই-ই থেকে গেল। এর মধ্যে দুই বছর কেটে গেল। বড় মাপের কিছু ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী অনেকেরই আয় বেড়েছে এবং বাড়বে এ দুই বছরে। তাহলে নিশ্চিতভাবেই বলা যাচ্ছে অন্যকিছু, মানুষের আয় কমছে এবং কমবে। কেননা, দুই বছর পরেও সবার আয়ের যোগফল একই থাকছে। ব্যাপারটা এমন—কেকের মাপ বাড়ল না অথচ কারো কেকের টুকরা বড় হলো, তাহলে নিশ্চিতভাবে অন্যের কেকের টুকরাটি ছোট হবেই। অতিমারির আঘাতে বহু মানুষের আয় কমে গিয়েছে, বহু মানুষের আয় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আবার অল্প কিছু মানুষের আয় ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আয়ের এমন নির্মম পুনর্বণ্টন ঘটে গিয়েছে। যা আগেই বলেছি, অসাম্য সব সময়ই ছিল এবং কয়েক দশক ধরে তা বৃদ্ধিও পাচ্ছিল। কেননা, মধ্য-উচ্চ বা অতি উচ্চ শ্রেণির আয় যে হারে বাড়ছিল, নিচের দিকে ততটা বাড়ছিল না। তারপরও কিন্তু দারিদ্র্যের হার ক্রমাগতভাবে কমছিল। কিন্তু এবার ঐসব সূত্র একেবারে দুমড়েমুচড়ে গিয়েছে কোভিডের ধাক্কায়। সব হিসাব একেবারে উলটেপালটে দিয়েছে।
অসাম্যের হাত ধরে দেশের ভবিষ্যত্ নিয়ে যে বড় ধরনের অশনিসংকেত ঘনীভূত হচ্ছে, তা যেন এক সর্বগ্রাসী আকালে পরিণত না হয় তা নিয়ে ভাবতে হবে সবাইকে। সমাজের যে স্তরের মানুষই হোক না কেন, দায়বদ্ধতার আবেগটি শিল্পমানের উত্কর্ষ ছুঁতে না পারলে তা নেহাতই প্রচারমূলক বা প্রোপাগান্ডা হয়ে যায়। এ দায়বদ্ধতাই আজকের অসাম্যের বাতারণে সবচেয়ে প্রধান অনুভূতিসম্পন্ন ভাবনা হওয়ার কথা ছিল। এ ভাবনা শুধু অর্থনীতিবিদের নয়, একজন দায়িত্বশীল শিল্পীও এ ভাবনা থেকে দূরে নয়। শিল্পী এবং বুদ্ধিজীবীর দায়িত্ব একে অপরের পরিপূরক। সত্য কথা বলা এবং মিথ্যাকে প্রকাশ করা বুদ্ধিজীবী এবং শিল্পী—উভয় শ্রেণিরই কাজ। সত্য হলো তারই প্রকাশ, যা মানুষের কাজ আর জ্ঞানকে নিশ্চিত করবে, স্পষ্টতা দেবে, শক্তিশালী করবে। শিল্পী তার শিল্পকর্ম, কবিতা-গান, চলচ্চিত্র-নাটক-ছবি দিয়ে আর বুদ্ধিজীবী তার কথা ও লেখা দিয়ে যেভাবে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দুর্ভেদ্য ব্যারিকেড তৈরি করতে পারে, সেভাবে সমাজের এ ভয়াবহ অসাম্যের সত্য চিত্রও তুলে ধরতে পারে; কিন্তু বাস্তব আমাদের উলটোটাই দেখাচ্ছে। আজ এ মহাদুর্যোগে সত্যের অস্তিত্ব বিপন্ন। আসল সত্য যে কোথায়, তা গুলিয়ে দেওয়ার সব ব্যবস্থাই কিন্তু তৈরি হয়ে আছে। আর সে কারণেই সত্য কথাটা মানুষের কাছে নিয়ে যেতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছে সবাই। গোপন আর ব্যক্তিগত ফ্যাসিবাদের এ মিলনক্ষণে শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, অর্থনীতিবিদ, সমাজসেবক—সবাই যেন ঘুমিয়ে আছে। সব কোলাহল ভেদ করে শোনা যাচ্ছে না নাটকের শেষ দৃশ্যে বিবেকের গান—‘শোনো গো দেশবাসী, কত নিদ্রা যাবে তুমি’।
অতিমারির মুহুর্মুহু ঢেউয়ে বিশ্ব অর্থনীতি যখন বিপর্যস্ত, বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে বিশেষজ্ঞরা যখন কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা এবং অর্থনীতির হাল ফেরাতে বিভিন্ন রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে সরব, তখন বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে দুবেলা দুমুঠো খেতে পাওয়ার মতো মৌলিক অধিকারও বৃহত্ অংশের নাগরিকের জন্য সুরক্ষিত নয়। শিল্পী হোক, বুদ্ধিজীবী হোক, সমাজসেবক হোক, অর্থনীতিবিদ হোক—তারা বরং দুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণের ওপর লেখালেখি করতে চায়; কিন্তু ভুলেও দুর্গত মানুষের স্থায়ী পুনর্বাসন ও বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থার কথা জোরেশোড়ে বলতে পারে না। তাই এক্ষেত্রে প্রয়োজন সেই সত্যটি বলা, সেই অসাম্যের কথাটি বলা। কিছু মানুষের আয় বেড়েছে মানে, অন্য অনেকের আয় কমেছে; কিন্তু আমাদের সমাজে এগুলো নিয়ে বলার কেউ নেই। বরং এগুলো থেকে চোখ ফিরিয়ে নিতে নিদ্রা যাওয়ার লক্ষণই বেশি।
n লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা