রাজধানীর সড়কে চালকদের অকারণে গাড়ির হর্ন বাজানোর ফলে মারাত্মকভাবে বাড়ছে শব্দদূষণ। কেউ হর্ন বাজাচ্ছেন ওভারটেক করার জন্য, কেউবা একই কাজ করছেন সড়কে বাঁক নেওয়ার জন্য। আবার ফাঁকা সড়কে কিছুটা গতি বাড়িয়ে মনের সুখে হর্ন বাজানোর প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেন কেউ কেউ। রাজধানীতে শব্দের সহনীয় মাত্রা ৫০ ডেসিবেল বলা হলেও হাইড্রোলিক হর্নের কারণে ঢাকায় শব্দের গড় মাত্রা ৯৫ ডেসিবেল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে ২০২১ সাল নাগাদ প্রায় অর্ধেক মানুষ শব্দ দূষণে আক্রান্ত হবে এবং শ্রবণশক্তি কমার পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রাসহ নানা রোগে আক্রান্ত হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীজুড়েই অসহনীয় যানজট ও হাইড্রোলিক হর্ন, নির্মাণ যন্ত্রের বিকট শব্দে অতিষ্ঠ নগরবাসী। অনিয়ন্ত্রিত শব্দদূষণ আমাদের জীবনে মারাত্মক ক্ষতির প্রভাব ফেলছে। ক্রমাগত শব্দ দূষণের ফলে আমাদের মধ্যে নানা রোগের সৃষ্টি হচ্ছে। শব্দ দূষণের বিরুদ্ধে আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই বললেই চলে। সর্বোপরি আমাদের দেশের জনগণ সচেতন নয় বলেই শব্দ দূষণ বর্তমানে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
রাজধানীতে বিভিন্ন এলাকায় শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। কিন্তু সেই মাত্রার পরিমাণ কোথাও ঠিক নেই। পরিবেশ অধিদপ্তরের এক জরিপে জানা যায়, ঢাকায় যানবাহনের শব্দের পরিমাণ ৯৫ ডেসিবেল, কল-কারখানায় ৮০-৯০ ডেসিবেল, সিনেমা হল ও রেস্তোরাঁতে ৭৫-৯০ ডেসিবেল, যে কোনো অনুষ্ঠানে ৮৫-৯০ ডেসিবেল, মোটরবাইকে ৮৭-৯২ ডেসিবেল, বাস এবং ট্রাকে ৯২-৯৪ ডেসিবেল যার সবকটিই মানুষের মস্তিষ্কের বিকৃতি এবং জটিল সব রোগ সৃষ্টি করে।
অধিদপ্তরের অন্য এক জরিপে জানা যায়, শয়নকক্ষে ২৫ ডেসিবেল, ডাইনিং এবং ড্রয়িং কক্ষের জন্য ৪০ ডেসিবেল, অফিসের জন্য ৩৫-৪০ ডেসিবেল, শ্রেণিকক্ষের জন্য ৩০-৪০ ডেসিবেল, লাইব্রেরির জন্য ৩৫-৪০ ডেসিবেল, হাসপাতালের জন্য ২০-৩৫ ডেসিবেল এবং সর্বোপরি ৪৫ ডেসিবেলের বেশি হওয়া উচিত নয়। অথচ রাজধানীতে সৃষ্ট শব্দের সীমা স্বাভাবিক সর্বোচ্চসীমার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।
শ্যামলী সিনেমা হলের সামনে কথা হয় টেক্সিচালক গিয়াস উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি ভিড়ের মধ্যে অকারণেই হর্ন বাজিয়ে যাচ্ছেন। কারণ জানতে চাইলে বলেন, হর্ন না বাজালে গাড়ি সরে না। অপ্রয়োজনে হর্ন বাজালে জরিমানার বিষয় সম্পর্কেও তিনি অবহিত নন বলে জানান অকপটে। তবে হাইড্রোলিক হর্ন বাজালে জরিমানা হয় বলে জানান এই চালক। আরেক চালক তাহের মিয়া বলেন, এতো নিয়ম জাইন্যা কি হইবো, সবাই হর্ন বাজায় আমিও বাজাই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতার অভাবই মূলত এই শব্দদূষণের বড় কারণ। উচ্চস্বরে পাশের ফ্ল্যাটের কেউ মিউজিক বা গান বাজানোর আগে একবারও চিন্তা করে না, যে আশপাশে কোনো অসুস্থ বৃদ্ধ বা শিশু থাকতে পারে। এটা যে, অন্যায় সেটা আমাদের সমাজের বেশিরভাগ মানুষই জানে না। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতাল এলাকাকে নীরব এলাকা ঘোষণা করা হলেও গবেষণায় দেখা গেছে, এসব এলাকায় শব্দের মাত্রা ৩ গুণ বেশি।
২০১৭ সালের ২৩ আগস্ট হাইড্রোলিক হর্ন নিষিদ্ধ করে হাইকোর্ট। শব্দদূষণ আইনে হাইড্রোলিক হর্ন বাজালে ২শ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু সেই আইন অনেকেই জানেন না। ট্রেন, লঞ্চের উচ্চ হর্ন বাজিয়েই চলছেন চালকরা। ফলে শব্দদূষণের শিকার হচ্ছে মানুষ। অকারণে হর্ন বাজালে ১শ টাকা জরিমানার বিধান আছে, তবে আইনের এ সব বিষয় অনেক চালকই জানেন না। অন্যদিকে শব্দদূষণ করছে নির্মাণ কাজে ব্যবহূত নানা যন্ত্র। অথচ ঢাকা ইমারত বিধিমালা অনুযায়ী, সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত মেশিনে শব্দ করা যাবে না বলা থাকলেও আইন মানা হচ্ছে না। ফলে শব্দদূষণের শিকার হচ্ছে নগরবাসী।
এ বিষয়ে স্যার সলিমুলাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের নাক, কান, গলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মনিলাল আইচ ইত্তেফাককে বলেন, শব্দদূষণের ফলে আমাদের তাত্ক্ষণিক মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, এসিড নিঃসরণ বেড়ে যায়। তা ছাড়া ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। শ্রবণশক্তি কমে যায়। উচ্চশব্দের কারণে মাথাব্যথা হয়। উচ্চশব্দের প্রভাব শিশুদের ও গর্ভবতী মায়েদের ওপর বেশি পড়ে। উচ্চশব্দের কারণে কানে কম শুনতে শুনতে এক সময় বোধিরতা তৈরি হয় এবং ঢাকা শহরের এক-তৃতীয়াং মানুষ শব্দদূষণে আক্রান্ত, শ্রবণশক্তি কমে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০২১ সাল নাগাদ প্রায় অর্ধেক মানুষ শব্দদূষণে আক্রান্ত হবে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে সরকারের পদক্ষেপ এবং আইনের বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
প্রিভেনটেবল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, শব্দদূষণের ফলে শ্রবণশক্তি কমে যায়। ধীরে ধীরে তা বোধিরতার পর্যায়ে চলে যায়। কানে যখন বেশি শব্দ লাগে তখন স্নায়ুতন্ত্র বেশি উত্তেজিত হয়ে হার্ট রেট বেড়ে যায়, পালস্ রেট বেড়ে যায়। এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়। শব্দের কারণে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, কখনো কখনো নিদ্রাহীনতাও তৈরি হয়।