আলোকপাত

মানুষ যদি ভালো না থাকে উন্নতি দিয়ে কী হবে?

সমাজ ও দেশের উন্নতি যদি পরিপূরক না হয় তবে কোনো উন্নয়নই টেকসই হয় না। দীর্ঘ মেয়াদী উন্নয়নের শর্ত হচ্ছে সমাজ প্রগতি। আমাদের দেশের আর্থিক উন্নতি দৃশ্যমান হলেও সমাজ সেভাবে এগুচ্ছে না। সমাজে পরিবর্তন যদিও দৃশ্যমান কিন্তু সমস্যা প্রকট। খবর দেখলে আমাদের রক্তচাপ থেমে থাকতে চায় না। বাড়তেই থাকে। একটা বিষয় মনে রাখা দরকার উন্নতি ও সমাজ শৃঙ্খলা সমানভাবে চলে না। বরং উন্নত দেশের সমাজে সমস্যার ধরন গভীর। গরীব দেশে সমস্যাগুলো মৌলিক। অন্ন-বস্ত্র-চিকিত্সা-বসতবাড়ি লেখাপড়া এসব সমস্যার চাপে চ্যাপ্টা মানুষের অন্য কিছু ভাবার সময় থাকে না। দেশ যত উন্নত হয় বেশিদিন, ততো অন্য সমস্যাগুলো মুখ বাড়িয়ে থাকে। মানুষের স্বভাব তাই। তার একদিক পূর্ণ হলে অন্যদিকে অপূর্ণতা থাবা বিস্তার করে। আজকাল দেশের সামাজিক সমস্যাও তাই ভিন্ন ধরনের।

আত্মহত্যার কথায় আসি। এত অভিমানী সমাজ ছিল না আগে। বনিবনা না হলে বা মত না মিললে স্বামী-স্ত্রীর মত গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কে এমন জটিলতা আগে দেখা যেতো না। কারণ তখন সমাজ ছিলো যূথাবদ্ধ। মানুষে মানুষে মেলামেশা আর বন্ধন ছিলো মৌলিক। বায়বীয় সম্পর্ক শুরু হবার পর তার আকার-আয়তন- পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উটকো ঝামেলাও ঢুকেছে বানের পানির মতো। মূলত সামাজিক মিডিয়ার ভয় আর আতঙ্কেই মানুষ ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে। স্বামী-স্ত্রীর কলহ বা ঝগড়া খুব নিয়মিত একটা বিষয়। দুজন মানুষ আসে দুটো ভিন্ন পরিবার থেকে। তাদের জন্ম থেকে বড় হয়ে ওঠা একেবারেই আলাদা। রুচি খাবার পোশাক সংস্কৃতি সবকিছু মিলিয়ে নিতে একজীবন আসলেই যথেষ্ট না। তারপরও আমাদের দেশেই পরিবার টেকে। একবিবাহে অভ্যস্ত হতে পারাই আমাদের সংস্কৃতি। এজন্যে চাই সমঝোতা তার চেয়ে বেশি দরকার ছাড় দেওয়া। আমাদের সময় আমরা এত তথ্য প্রবাহ বা মিডিয়াবন্দি ছিলাম না। কে কোথায় যাচ্ছে কোথায় থাকছে বা কখন আসছে জানাটাও ছিলো কঠিন। তারুণ্যে যখন কলকাতা যেতাম পথেই লেগে যেতো দু’দিন। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা, ঢাকা থেকে যশোর, যশোর থেকে বেনাপোল। তারপর পৌঁছে গিয়ে পোষ্টকার্ড ছেড়ে দেয়া। সে চিঠি দেশে পৌঁছুতে লাগত এক সপ্তাহ। এতদিন মা বাবারা ধৈর্য ধরে থাকতেন। স্বামী-স্ত্রী থাকতেন সবুর করে। মনে বিশ্বাস আর ভরসাই ছিল অবলম্বন। আজকাল কে কোথায় আছে বা কী করছে সেটা যাবার আগেই জানা হয়ে যায়। পথের ছবি বাসের ছবি নামার ছবি ওঠার ছবি দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া মানুষ তাই ভরসার জায়গাটা হারিয়ে ফেলেছে প্রায়।

এত তথ্য বা এত জানাজানি একদিকে যেমন ভালো আরেকদিকে এর কুফল ভোগ করছে সমাজ। বিশ্বাস যে কতভাবে টাল খাচ্ছে মনে মনে। বন্ধুত্বের নামে অবাধ সম্পর্ক কার মনে না সন্দেহের উদ্রেক করে? একবার আমি লিখেছিলাম ইনবক্স ব্যাপারটা না থাকলে জুকার বার্গকে পথে বসতে হতো। তখন অনেকে রাগ করেছিলেন। কিন্তু এটা কি মিথ্যা? এই ইনবক্সের কারণেই আজ স্বামী স্ত্রীর ভেতর এত বিবাদ। যখন তা কোনোভাবে বেরিয়ে আসে তখন যেকোন একজনের ফেরার পথ বন্ধ। যার পরিণতি আত্মহনন। বলছি না যে এটাই একমাত্র কারণ। আসলে প্রযুক্তির ব্যবহার বড় বিষয়। আমি সিডনির মত শহরে কিন্তু এর এমন প্রকোপ দেখি না। কারণ প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টা হয়তো তারা আগেই জেনে যায়। আর একটা কারণ মুক্ত সমাজে যখন বিষয়গুলো প্রকাশ্য বা সহজলভ্য তখন এত গোপনীয়তার আর কি দরকার? যখন যা খুব গোপন তখনই তা উস্কানীর কেন্দ্র। আজকের বাংলাদেশে নবদম্পতি কিংবা মধ্যবয়সীদের জীবনে তাই সামাজিক মিডিয়া সমস্যা না সম্ভাবনা তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।

আমাদের সামনে সারাবিশ্বের মত এই চ্যালেঞ্জ আজ দুয়ারে। সামাজিক মিডিয়া ও জীবনের ভেতর সেতু গড়ে তোলার পাশাপাশি সন্তনাদের সচেতন করা জরুরি। নিয়ন্ত্রণ হারানোর আগেই স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হতে হবে স্বচ্ছ। সেটাই আমাদের জীবনবোধ ও সংস্কৃতি। পশ্চিমের সমাজ যত আগুয়ান হোক তাদের শান্তি কম। আমরা উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সেদিকে ধাবিত হচ্ছি। রাজনীতি পারুক না পারুক মানুষকে পারতেই হবে। মানুষ ভালো না থাকলে নিরাপদ না থাকলে কোনো উন্নতিই টিকবে না। নো থিংকিং আর হাই লিভিং-এর কবল থেকে ফিরতে হবে প্লেইন লিভিং আর হাই থিংকিং-এর যুগে। সাধারণ জীবনযাপন আর উচ্চ চিন্তাতেই আছে সমাধান।

n লেখক :সিডনি প্রবাসী প্রাবন্ধিক