রিজার্ভ চুরি অবশেষে মামলা

 

২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার (যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮১০ কোটি টাকার সমপরিমাণ) চুরি করতে সমর্থ হয় হ্যাকাররা। এই ঘটনার তিন বছর পর গত ৩১ জানুয়ারি নিউইয়র্কের সাদার্ন ডিসট্রিক্ট কোর্টে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে। ওই মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ১৫ মে যে পাঁচজন ভুয়া ব্যক্তির নামে ফিলিপিন্সে ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো খোলা হয়েছিল সেই নামগুলো হলো-মিশেল ফ্রান্সিকো ক্রুজ, জেসি ক্রিস্টোফার এম. ল্যাগ্রোসাস, আলফ্রেড সান্তোস ভেরগারা, এনরিকো টেওডোরো ভাসকয়েজ এবং রালফ ক্যাম্পো পিকাচি। এই অ্যাকাউন্টগুলো এমনভাবে খোলা হয়েছিল, যাতে সেগুলোর মাধ্যমে মার্কিন ডলারে অর্থ লেনদেন করা যায়। সবগুলো অ্যাকাউন্ট মাত্র ৫০০ মার্কিন ডলার দিয়ে খোলা হয়েছিল। এরপর ২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারির আগে ওই অ্যাকাউন্টগুলো থেকে কোনো ধরনের লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

‘ক্রুজ অ্যাকাউন্টে’ বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন অ্যান্ড ফাইনান্সিং ফ্যাসিলিটি (আইপিএফএফ) প্রজেক্ট সেল থেকে, ‘ল্যাগ্রোসাস’ অ্যাকাউন্টে ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রান্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট থেকে, ‘ভেরগারা’ অ্যাকাউন্টে ভেড়ামারা কমবাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্রজেক্ট থেকে এবং ‘ভাসকয়েজ’ অ্যাকাউন্টে কাঁচপুর-মেঘনা-গোমতী ২ প্রজেক্ট থেকে কনসালটেন্সি ফি হিসেবে অর্থ জমা দেখানো হয়।

বিবিসর সংবাদ অনুযায়ী, পাঁচটি অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রেই হিসাব খোলার   সময় দেওয়া যোগাযোগের ঠিকানায় ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল। রিজার্ভ চুরির ঘটনার পরে ওই সব ঠিকানায় গিয়ে ওইসব নামে কোনো ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়নি। এমনকি পিকাচি নামের অ্যাকাউন্টে যোগাযোগের পর্যাপ্ত তথ্যও ছিল না।

গত ১০ জানুয়ারি এই ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ফিলিপাইনের রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকের শাখা প্রধান মায়া সন্তোষ দেগুইতোকে ৩২ থেকে ৫৬ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে ফিলিপিন্সের একটি আদালত। সেইসঙ্গে তাকে ১০ কোটি ৯০ লাখ ডলার জরিমানাও করা হয়।

যেভাবে ঘটনা শুরু: ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ছিল বৃহস্পতিবার। পরের দুদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সাপ্তাহিক ছুটি। অন্যদিকে, চীনা নতুন বর্ষ উপলক্ষে আরসিবিসি ব্যাংকের তিনদিনের ছুটি শুরুর কথা সোমবার, ৮ ফেব্রুয়ারি। আর সেই সুযোগটাই নিয়েছিল উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা, যারা পেছনে থেকে চুরির কাজটি করেছিল। বিবিসির সংবাদ অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলার বিবরণ এমনটাই বলছে। হ্যাকাররা ‘নেসট্যাগ’ ও ‘ম্যাকট্রাক’ নামক ম্যালওয়্যার ব্যবহার করে নেটওয়ার্কে ঢুকতে পেরেছিলো। পূর্বে নির্ধারিত বাংলাদেশ ব্যাংকের নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ করার পর ৪ ফেব্রুয়ারি রাত ৮:৩৬ মিনিট নাগাদ সুইফট সিস্টেমে লগ-ইন করতে সমর্থ হয় হ্যাকাররা। পরে রাত প্রায় ৮:৫০ থেকে ১০:৩০টা পর্যন্ত নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ থেকে প্রায় এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার সরানোর জন্য ৩৬টি পেমেন্টে অর্ডার পাঠায় তারা। ট্রানজেকশনের তথ্যের গড়মিলের কারণে সেখান থেকে মাত্র একটি পেমেন্ট অর্ডার মধ্যবর্তী আরেকটি ব্যাংকে আটকে যায়। বিশ মিলিয়ন ডলারের ওই পেমেন্ট অর্ডারটি করা হয় শ্রীলঙ্কার ‘শালিকা ফাউন্ডেশনের অনুকূলে। কিন্তু প্যান এশিয়া ব্যাংকিং করপোরেশন সেখানে বানান ভুলটি ধরে ফেলে। বাকি ৩৫টি পেমেন্ট অর্ডার নিউইয়র্ক ফেড বাতিল করে দেয়, কারণ সেখানে মধ্যস্থকারী (ইন্টারমেডিয়ারি) ব্যাংকের পর্যাপ্ত তথ্য ছিল না। পরবর্তীতে হ্যাকাররা সেসব তথ্য আপডেট করে পুনরায় ৩৪টি পেমেন্ট অর্ডার পাঠায়। এটি ঘটেছিল বৃহস্পতিবার রাত ১১:৩০টা থেকে শুক্রবার রাত ১:০০টার মধ্যে। ওই রাতেই ৩:৫৯ মিনিটে হ্যাকাররা সুইফট সিস্টেম থেকে লগ-আউট করে। সেসময় তাদের কর্মকাণ্ডের প্রমাণ না রাখতে হ্যাকাররা একটি ম্যালওয়ার  ব্যবহার করে। এগুলো পেমেন্ট অর্ডারের পরপরই সকল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য স্বয়ংস্ক্রিয়ভাবে ডিলিট করে দেয়। পেমেন্টের সময় সব তথ্যগুলো যাতে সুইফট প্রিন্টারে বের না হয়, সেজন্য একটি প্রিন্টার বন্ধ করে দেয়া হয়। যার ফলে মাত্র চারটি পেমেন্ট অর্ডার কার্যকরী হয়েছিল বলে মামলার নথিতে বলা হয়েছে। পরে এই অর্থই ফিলিপিন্সে ক্যাসিনোর মাধ্যমে বেহাত হয়ে যায়।

চুরি হওয়া রিজার্ভের টাকা আগামী তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ফেরত পাবে বলে আশা প্রকাশ করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসি। গত রবিবার তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা করা হয়েছে। বছর তিনেকের মধ্যে টাকা ফেরত আসবে বলে আশা করা যায়। তবে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এ সময় কমতে বা বাড়তে পারে। এই মামলায় খরচ হবে ঘণ্টার হিসাবে।

যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সাদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে যে মামলা করা হয়েছে সেখানে ফিলিপিন্সের পাঁচটি আর্থিক ও ক্যাসিনো প্রতিষ্ঠান, ফিলিপিন্সের ১২ জন নাগরিক এবং তিনজন চীনা নাগরিকসহ রয়েছেন মোট ২০ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা হয়েছে। তারা হচ্ছেন—

১.     ফিলিপিন্সের অন্যতম বড় ব্যাংক ‘রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশন’ বা আরসিবিসি

২.     ফিলিপিন্সের নাগরিক এবং আরসিবিসি ব্যাংকের জুপিটার শাখার সাবেক ম্যানেজার মায়া দেগুইতো

৩.     ফিলিপিন্সের নাগরিক এবং আরসিবিসি ব্যাংকের জুপিটার শাখার সাবেক সিনিয়র কাস্টমার রিলেশনস অফিসার অ্যাঞ্জেলা রুথ টরেস

৪.     ফিলিপিন্সের নাগরিক এবং আরসিবিসি ব্যাংকের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট এবং সিইও লরেনজো ভি. ট্যান

৫.     ফিলিপিন্সের নাগরিক এবং আরসিবিসি ব্যাংকের তত্কালীন রিটেইল ব্যাংকিং গ্রুপের প্রধান রাউল ভিক্টোর বি. ট্যান

৬.     ফিলিপিন্সের নাগরিক এবং আরসিবিসি ব্যাংকের তত্কালীন রিটেইল ব্যাংকিং গ্রুপের ন্যাশনাল সেলস ডিরেক্টর ইজমায়েল এস, রেয়েস

৭.     ফিলিপিন্সের নাগরিক এবং আরসিবিসি ব্যাংকের তত্কালীন রিটেইল ব্যাংকিং গ্রুপের রিজিওনাল সেলস ডিরেক্টর ব্রিজিট আর ক্যাপিনা

৮.     ফিলিপিন্সের নাগরিক এবং আরসিবিসি ব্যাংকের তত্কালীন ডিস্ট্রিক্ট সেলস ডিরেক্টর নেস্টর ও. পিনেডা

৯.     ফিলিপিন্সের নাগরিক এবং আরসিবিসি ব্যাংকের জুপিটার শাখার তত্কালীন কাস্টমার সার্ভিসের প্রধান রোমুলডো এস. অ্যাগ্রাডো

১০.   ম্যানিলার ব্যবসায়িক সংগঠন ‘ফিলরেম সার্ভিস কর্পোরেশন’

১১.   ফিলিপিন্সের নাগরিক এবং ফিলরেম-এর সহ-স্বত্বাধিকারী সালুদ বাতিস্তা

১২.   ফিলিপিন্সের নাগরিক এবং ফিলরেম-এর সহ-স্বত্বাধিকারী মিশেল বাতিস্তা

১৩.   ফিলিপিন্সের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘সেঞ্চুরিটেক্স ট্রেডিং’

১৪.   ফিলিপিন্সের নাগরিক এবং সেঞ্চুরিটেক্স ট্রেডিং-এর মালিক উইলিয়াম সো গো

১৫.   ফিলিপিন্সের ক্যাসিনো প্রতিষ্ঠান ‘ব্লুমবেরি রিসোর্ট অ্যান্ড হোটেলস’-এর সোলেয়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনো

১৬.   ফিলিপিন্সের ক্যাসিনো প্রতিষ্ঠান ‘ইর্স্টান হাওয়াই লেইজার কোম্পানি লিমিটেড’-এর মাইডাস হোটেল অ্যান্ড ক্যাসিনো

১৭.   ফিলিপিন্সের নাগরিক এবং ইস্টার্ন হাওয়াই লেইজার কোম্পানি লিমিটেড-এর একজন স্বত্বাধিকারী কাম সিন ওয়ং ওরফে কিম ওয়ং

১৮.   চীনের নাগরিক ওয়েকাং জু

১৯.   চীনের নাগরিক ডিং ঝিঝে

২০.   চীনের নাগরিক গাও শুহুয়া