টঙ্গা দ্বীপে ৭ দিন থাকার পরিকল্পনা, কাটিয়ে দিলেন দেড় বছর

সাতশ বছর বয়সী ব্রিটিশ ভ্রমণকারী জো স্টিফেন্স ভ্রমণের নেশায় যুক্তরাজ্যের মার্সিসাইডের ক্রসবি থেকে এসেছিলেন চীনে। মাত্র সাত দিন থাকার পরিকল্পনা থাকলেও টঙ্গা দ্বীপে আটকে আছেন দেড় বছর ধরে।

যুক্তরাজ্যের মার্সিসাইডের ক্রসবি থেকে চীনে চলে এসে এবং আড়াই বছর ধরে সেখানেই বাস করছিলেন। কেবলমাত্র সপ্তাহান্ত থাকার পরিকল্পনা করে, গত মার্চে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ দেশ টঙ্গায় ঘুরতে যান তিনি। 

করোনা ভাইরাস যখন সারা বিশ্বের আলোচনায়, তখন স্টিফেন্স  ১৭০ টিরও বেশি দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ নিয়ে গঠিত পলিনেশিয়ান দেশ টঙ্গায় যাওয়ার একটি ফ্লাইট বুক করেছিলেন। কিন্তু প্রায় আঠারো মাস পরে, তিনি এখনও সেই ক্ষুদ্র দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে আটকে আছেন। যেটি বিশ্বের কয়েকটি স্থানগুলির মধ্যে একটি যা  সম্পূর্ণ কোভিড-মুক্ত। 

স্টিফেন্স বলেন, "আমি সম্ভবত বিশ্বের গুটিকয়েকজনের মধ্যে একজন যাদের পুরো মহামারীর সময় কখনো মাস্ক পরতে হয়নি। স্টিফেন্স অনলাইনে আন্তর্জাতিক যোগাযোগে স্নাতকোত্তর শুরু করেছেন এবং বর্তমানে বাস করছেন টঙ্গার একটি সমুদ্রতীরবর্তী বাড়িতে। বৈশ্বিক মহামারী একটি দূরর্বতী দ্বীপে বসে দেখা এবং তার প্রভাব না পরার জন্য নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে করেন তিনি। কিন্তু তার অভিজ্ঞতাটি যতটা চমকপ্রদ বলে মনে হলেও তা ততটা অসাধারণ ছিল না।"খুব কম মানুষই এটি উপলব্ধি করতে পারেবেন, একটি দ্বীপে এতদিন ধরে বন্ধু বা পরিবার ছাড়া আটকে থাকার অনুভূতি। তিনি আরও বলেন, টঙ্গা এখনও পর্যন্ত করোনা সংক্রামণ এড়িয়ে গেলেও, এখানকার বাসিন্দারা এই ভাইরাস এর দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে।  

করোনার বিস্তার ও বিশ্বজুড়ে তার প্রভাবে শঙ্কিত ছিলেন তিনিও। কিন্তু পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয় যখন সে চীন ছেড়ে দক্ষিণ কোরিয়া ঘুরতে যান। তখন সে দেশ থেকে দূরে থাকলেও তার দেশে করোনার সংক্রামণও বাড়ছিল দিন দিন। করোনা পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে উঠে এবং ধীরে ধীরে সীমানা বন্ধ করে দেওয়া শুরু হয়। স্টিফেন্স যখন চীনে ফিরে আসেন তখন কোয়ারেন্টিনে থাকা এড়াতে তিনি ভ্রমণে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

কিন্তু তিনি যখন ফিজি থেকে টঙ্গার উদ্দেশ্যে রয়না দেন তখন তার ট্যাক্সিচালকের মাধ্যমে জানতে পারেন দেশটি প্রথম একজনের শরীরে শনাক্ত হয়েছে এবং তখনই তিনি বুঝতে পারেন তিনি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেন " আমি হোটেলে যাওয়ার পর হোটেল কর্তৃপক্ষ বলেন, আপনি এইমাত্র ফিজি থেকে এসেছেন তাই আমরা আপনাকে এখানে রাখতে পারবো না।" "আমাদের তিন সপ্তাহের লকডাউন ছিল। সপ্তাহে একবার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে বাড়ি থেকে বের হওয়া যেত। সারা দেশে সবকিছু বন্ধ ছিল।"

টঙ্গা ২০২০ সালের মার্চ মাসে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিল এবং তখন থেকে দেশটি বিদেশী নাগরিকদের জন্য বন্ধ রয়েছে। প্রথম কয়েক মাস স্টিফেন্স ভাবেন  যে তিনি চীনে ফিরে যেতে পারবেন। এবং সীমানা পুনরায় খুলে দেওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। "আমি এক অদ্ভুত অস্থিরতায় প্রায় ছয় মাস কাটিয়েছি" বলে জনায় সে। কয়েক মাস ধরে চীনে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন তিনি চীনে খুব তাড়াতাড়ি  ফিরে যেতে পারবেন না। যদিও তার যুক্তরাজ্যে  ফেরার সুযোগ ছিল। "আমি গত বছর মার্চে আমি ফিরে যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু করোনা পরিস্থিতি সেখানে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছিল" তিনি বলেন।
  
তিনি তার অবসর সময়ে প্যাডেল বোর্ডিং এবং স্নোরকেলিং করেন, পাশাপাশি তার ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউব অ্যাকাউন্টগুলিতে তার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে পোস্ট করেন। "আমি এখানে সর্বোচ্চ খাপ খায়িয়ে চলার চেষ্টা করেছি। "কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলির মধ্যে একটি হল যুক্তরাজ্যের মানুষ, প্রতিনিয়ত আমাকে বলছে" আপনি খুব ভাগ্যবান কারণ এই মহামারীতে আমি এমন একটা জায়গায় থাকার সুযোগ পেয়েছি"।

অল্প দিন ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকায় স্টিফেন্স তার সাথে খুব কম জিনিস টঙ্গায় নিয়ে এসেছিলেন। "গত দেড় বছর ধরে, আমি আমার চশমা ছাড়া জীবন যাপন করছি, টঙ্গায় চশমা কেনার কোন জায়গা নেই," তিনি বলেন। তিনি আসার কয়েক মাস পরে, সাইক্লোন হ্যারল্ড দ্বীপপুঞ্জে আঘাত হানে এবং যে বাড়িতে তিনি থাকতেন তা পুরোপুরি প্লাবিত হয়ে যায়। তিনি যেটুকু অর্থ ও জিনিসপত্র নিজের সাথে নিয়ে এসেছিলেন তার প্রায় অর্ধেক কেড়ে নেয় সাইক্লোনটি।  
 
স্টিফেনস আসার আগে টঙ্গার জীবন সম্পর্কে খুব কমই জানতেন। অনেকেই বলে, "আপনি কিভাবে একটি স্বর্গীয় দ্বীপ ছেড়ে আসতে পারবেন। আমি এখানে থাকা নিজে বেছে নেয়নি। এখানে অন্য বিদেশীদের চাকরি আছে, তারা এখানে একটি কারণে আছেন কিন্তু আমার এখানে কিছুই করার নেই।"  "আমি ফিরে গেলে কি হবে তা নিয়ে আমি চিন্তিত। তারপর সবকিছু যদি আবার বন্ধ হয়ে যায় এবং সবাই লকডাউনে থাকে, তখন হয়তো আমি ভাববো 'আমার দ্বীপে থাকা উচিত ছিল।" টঙ্গা কোভাক্স ফ্যাসিলিটির মাধ্যমে কোভিড ভ্যাকসিনের চব্বিশ হাজার ডোজ পেয়েছে। স্টিফেন্স করোনা ভ্যাক্সিন পেয়েছেন এখানেই।

ইত্তেফাক/আইডি/এএইচপি